বুদ্ধদেব বেরা, জামবনি
মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়, এটা কোনও স্কুল নয়, যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আর সেই দ্বীপে কেউ কোথাও নেই। তিনি একা। বিরক্ত, বিষণ্ণ এবং অসহায়! আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলছেন, ‘কী ভাবে যে দিন কাটাচ্ছি তা কেবল আমিই জানি! ঠিক সময়ে স্কুলে আসছি। বিকেলে বাড়ি ফিরছি। স্কুলে কোনও পড়ুয়া নেই। কাজ নেই। জানি না, এ ভাবে কত দিন চলবে? শিক্ষক হিসেবে বড্ড বিপন্ন বোধ করছি, জানেন!’
তিনি লালচাঁদ মাণ্ডি। জামবনির মেঘরাজপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (Meghrajpur Primary School Jamboni) সবেধন নীলমণি শিক্ষক। স্কুলে পৌঁছনোর পরে রোজ তাঁর মনে হয়, খুদে পড়ুয়াকে নিয়ে এই বুঝি কোনও অভিভাবক স্কুলে ঢুকবেন। তারপরেই বলবেন, ‘ও মাস্টার, আমার ছেলেটা আপনার স্কুলে পড়বে বলেই গোঁ ধরেছে গো। না বললে শুনব না কিন্তু!’ কিন্তু ওই মনে হওয়াটুকুই সার! বেলা বয়ে যায়। দিন কেটে যায়। কেউ আর আসে না।
এক সময়ে মেঘরাজপুর ও ঝপলা গ্রামের ছেলেমেয়েদের ভরসা ছিল বাবুইদা প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৪–য় মেঘরাজপুরে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে মেঘরাজপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। চারটি শ্রেণিকক্ষ, অফিস ঘর, শৌচালয়, মিডডে মিলের রান্নাঘর— সবই তৈরি করা হয়। মেঘরাজপুর ও ঝপলা গ্রামের পাঁচ পড়ুয়াকে নিয়ে শুরু হয় পঠনপাঠনও। একটা সময়ে সর্বোচ্চ পড়ুয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ জন।
সেই শুরু থেকেই ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন লালচাঁদ। তবে পড়ুয়ার সংখ্যা ক্রমে কমতে শুরু করে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণির তিন জন পড়ুয়া উত্তীর্ণ হওয়ার পরে নতুন করে আর কেউ ভর্তি হয়নি ওই স্কুলে। ফলে চলতি (২০২৫–২৬) শিক্ষাবর্ষে একেবারেই পড়ুয়াশূন্য হয়ে পড়েছে স্কুলটি।
একতলা পাকা ভবনের অফিস ঘরে নিঃসঙ্গ বসে থাকেন লালচাঁদ। চারটি শ্রেণিকক্ষের দরজায় তালা ঝুলছে। শুনশান স্কুলে সিলিং ফ্যানের ক্যঁাচক্যাঁচ আওয়াজটা যেন আরও বেশি করে জানান দেয়, যাদের সৌজন্যে স্কুল গমগম করার কথা ছিল, তারা কেউ নেই। মেঘরাজপুরে সাতটি ও ঝপলায় ১৫টি আদিবাসী পরিবার রয়েছে। মেঘরাজপুরের বাসিন্দা ক্ষুদিরাম সরেন বলছেন, ‘এই মুহূর্তে স্কুলে ভর্তি হওয়ার মতো ছেলেমেয়ে গ্রামে নেই। কিন্তু স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেলে আর হয়তো কোনও দিন চালু হবে না।
স্কুল থেকে কিছুটা দূরে, আস্তাপাড়া গ্রামে বাড়ি লালচাঁদের। তাঁর কথায়, ‘সারাদিন চুপ করে স্কুলে বসে থাকতে ভালো লাগে না। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি, যে স্কুলে পড়ুয়া সংখ্যা বেশি অথবা শিক্ষক সংখ্যা কম সেখানে বদলি করে দেওয়ার জন্য। পরে এই স্কুলে পড়ুয়া ভর্তি হলে ফিরে আসব।’
ঝাড়গ্রাম (Jhargram) জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক অজয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, জেলায় ১২৯২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। মেঘরাজপুরের মতো কোনও স্কুল পড়ুয়াশূন্য নয়। ওই স্কুলের শিক্ষককে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ুয়ার খোঁজ করতে বলা হয়েছে। আপাতত স্কুলটি খোলাই থাকছে। সেই খোলা স্কুলে দখিনা বাতাসের মতো কবে হইহই করে ঢুকবে পড়ুয়ার দল, অপেক্ষায় আছে মেঘরাজপুরও!