• রত্নাবলীর হাত ধরেই শিক্ষার আলো পাচ্ছে জঙ্গলমহল
    এই সময় | ০৮ মার্চ ২০২৬
  • প্রশান্ত পাল, বরাবাজার

    শৈশবে যখন বাবাকে হারাতে হয়েছিল, তখন মেয়েটির বয়স বছর চারেক। বোন আরও ছোট। আর মাস দুয়েকের ভাই মায়ের কোলে। দিনমজুর বাবা কলেশ্বর শবরই ছিলেন সংসারের একমাত্র রোজগেরে। বাবার মৃত্যুতে মাথার উপরের ছাদটাই সরে গিয়েছিল। পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের (Purulia Jangalmahal) বরাবাজার ব্লকের লটপদা গ্রামের শবরটোলার সেই মেয়ে রত্নাবলী আজ শিক্ষার আলোর পথযাত্রী। রত্নাবলীর মা মনজুড়া শবর।

    স্বামীকে হারানোর পরে জঙ্গল থেকে ডালপালা কুড়িয়ে তা বেচে শুরু করেন জীবন-সংগ্রাম। বড় মেয়ে রত্নাবলীকে ভর্তি করলেন গাঁয়ের স্কুলে। একসময়ে সেই মেয়ে এলাকার হাইস্কুলে। রত্নাবলীই প্রথম মাধ্যমিক (Madhyamik) ও উচ্চ মাধ্যমিকে (HS) সাফল্যের আলো পৌঁছে দেন লটপদা গ্রামের উঠোনে। তবে অনেক গরিব পরিবারে যেমন হয়, তার আগেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন মনজুড়া। কিন্তু পড়াশোনা ছাড়েননি রত্নাবলী। শ্বশুরবাড়িতে প্রথমে তাঁর পড়াশোনা নিয়ে, পরে অশান্তি বাঁধে স্বামীর মদ খাওয়াকে ঘিরে।

    রত্নাবলী বললেন, 'প্রথমে তর্কবিতর্ক, শেষে গায়ে হাত তোলা শুরু হলো। একদিন মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দিল। আর থাকা হলো না শ্বশুরবাড়িতে।' রত্নাবলী ফিরলেন মায়ের অভাবের সংসারে। সঙ্গী পড়াশোনা করার জেদ। পাশে দাঁড়ালেন মা। বরাবাজার বিক্রম টুডু মেমোরিয়াল কলেজে শুরু হলো নতুন লড়াই। রত্নাবলীর কথায়, 'তখন যোগাযোগ হলো পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির সঙ্গে। আমাদের শবরটোলার কমিউনিটি লার্নিং সেন্টারে পড়ানোর দায়িত্ব পেলাম।' ২০২১-এ গ্র্যাজুয়েট হয়ে রত্নাবলী রাজনওয়াগড়ে খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতি পরিচালিত ছাত্রীনিবাসের ওয়ার্ডেনের গুরুদায়িত্ব পান। ওই ছাত্রীনিবাসের ক্লাস এইটের সনকা, প্রমিলা, শঙ্খলতা, শেফালি বা ক্লাস সেভেনের সঙ্গীতা, ময়নারা তাঁকে ছাড়া একটি দিনও ভাবতে পারে না। ওদের কথায়, 'ম্যাম আমাদের আদর্শ।'

    রত্নাবলী বললেন, 'ওরা আমার জীবনের বিরাট প্রাপ্তি। ওদের বুঝিয়ে চলেছি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পড়াশুনা করতে হবে ওরা বুঝছে। শবর সমিতির পরিচালক প্রশান্ত রক্ষিত জানালেন, সংগঠনের সদর দপ্তর রাজনওয়াগড়ের ছাত্রীনিবাসের ওয়ার্ডেন হিসেবে রত্নাবলী ছাড়া অন্য কারও কথা মনে হয়নি তাঁদের। প্রশান্ত আরও বললেন, 'রত্নাবলী এখন সমিতির সভানেত্রী। ছাত্রীনিবাসের দায়িত্ব সামলে জেলার বিভিন্ন শবর গ্রামের ছেলেমেয়েদের কল্যাণে কাজ করছে।' বরাবাজারের প্রাক্তন বিডিও মাসুদ রাইহান বললেন, 'প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে নিজের সম্প্রদায়ের কাছে আজ ও পথপ্রদর্শক।'

  • Link to this news (এই সময়)