বুদ্ধদেব বেরা ঝাড়গ্রাম
জঙ্গলপথে স্কুলে যাতায়াতের সময় রোজই মন খারাপ হয়ে যেত। নিত্যদিন চোখে পড়ত পুড়ে যাওয়া লতাপাতা, ডালপালা। কোথাও দেখা যেত রাতে ধরিয়ে দেওয়া আগুন তখনও ধিকি ধিকি জ্বলছে। কালক্ষেপ না করে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করতেন বনদপ্তরে। হদিশ দিতেন আগুনের। কিন্তু মন যেন মানতে চায় না। মনে হয় এ ভাবে হচ্ছে না। চাই এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে বিশেষ করে জঙ্গলবাসীকে (Wild Life) এর বিরুদ্ধে সচেতন করা। তাই নেমে পড়েন সেই কাজে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে গাছে গাছে লাগিয়ে দিতে থাকেন পোস্টার। যেখানে থাকে জঙ্গল থেকে সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের রক্ষা করার বার্তা।
জামবনি ব্লকের ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মনোজিৎ মাইতি। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) নির্দেশে চাকরি বাতিল হওয়া ২০১৬ প্যানেলের চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষক মনোজিৎ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চলতি বছরের ৩১ অগস্ট পর্যন্ত তাঁর চাকরি রয়েছে। এখন তিনি জামবনি ব্লকের পড়শুলি ঝাড়েশ্বর হাই স্কুলের বাংলার শিক্ষক। স্কুলের পথে মোটরবাইক থামিয়ে একদিন মনোজিৎ দেখেন জঙ্গলে লাগানো আগুনের আঁচে ঝলসে মরে পড়ে রয়েছে তিনটি টিয়াপাখির ছানা। মনকে ধাক্কা দিয়েছিল সেই ছবি। নিজের টাকায় পোস্টার ছাপিয়ে জঙ্গলে আগুন লাগানো রোধ করতে গাছে গাছে পোস্টারিং শুরু করেন মনোজিৎ। তবে একা নন, সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছেন তাঁরই স্কুলের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক অঞ্জন মাহাতোকে।
ঝাড়গ্রাম মূলত শালের জঙ্গল। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই গাছের শুকনো পাতা ঝরা শুরু হয়। আর তাতে হামেশাই আগুন ধরানোর ঘটনা সামনে আসে। যার ফলে অনেক সময়েই জঙ্গলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঝাড়গ্রামের জঙ্গলগুলিতে প্রচুর খরগোশ, বনশূকর, নেকড়ে, শেয়াল, টিয়াপাখির মতো পশু-পাখি রয়েছে। সারা বছর হাতির দলও আস্তানা গাড়ে সেখানে। ফলে জঙ্গলে আগুন লাগলে তাদেরও প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে। ঝাড়গ্রাম দমকল বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, জঙ্গলের আগুন নিয়ন্ত্রণে দুটি ইঞ্জিন সর্বদাই কাজ করে। বন দপ্তরের তরফেও জঙ্গলে আগুন লাগানো রুখতে নজরদারি এবং মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
মনোজিতের বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে। মোটরবাইকে যাতায়াত করেন তিনি। গিধনি থেকে বেলদা পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে চিল্কিগড়ের জঙ্গল, বেলদার জঙ্গল ও টুলিবড়ের জঙ্গল রয়েছে। দেখতেন জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বলছে। ঠিক করেন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। ‘জঙ্গল ও বন্য প্রাণীদের রক্ষা করুন’ পোস্টার লিখে গাছে গাছে লাগাতে শুরু করেন। মনোজিৎ বলেন, ‘স্কুল থেকে ফেরার পথে টিয়াপাখির তিনটি ছানা যে ভাবে মরে পড়েছিল জঙ্গলের মধ্যে তা দেখে আমার খুবই খারাপ লাগে। তাই জঙ্গল বাঁচাতে মানুষকে সজাগ করার জন্য এই কাজ শুরু করেছি। প্রতিদিন স্কুলে বেরোনোর সময় ব্যাগে পোস্টার নিয়ে যাই। রাস্তার দু’পাশের জঙ্গলে গাছে পোস্টার লাগাই। এ বার অন্যান্য জঙ্গলেও এই পোস্টার দেবো।’ জঙ্গলে আগুন ধরানো বন্ধ করতে ও জঙ্গলের গুরুত্ব বোঝাতে স্কুলেও সেমিনার করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আর অঞ্জনের কথায়, ‘আমি একজন জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক। জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব কী তা বুঝি। তাই জঙ্গল ও বন্যপ্রাণ রক্ষায় আমিও মনোজিতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি।’
মনোজিৎ ও অঞ্জনের জঙ্গল রক্ষার এই উদ্যোগে খুশি বনদপ্তর। বনমন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা বলেন, ‘জঙ্গলে আগুন লাগানো রুখতে আমরা নানা ভাবে মানুষকে সচেতন করছি। নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। তার পরেও কিছু নির্বোধ মানুষ সেই কাজ করে চলেছে। মনোজিৎ, অঞ্জনের মতো শিক্ষক যে ভাবে এগিয়ে এসেছেন তা সাধুবাদে যোগ্য।’