সূর্যকান্ত কুমার, কালনা
নেশাটা ছিল না। প্রতিবেশী জেঠুকে দেখে সেই নেশাই চেপে বসে মাথায়। সাপ ধরার জেদ থেকেই শুরু। আর সেই ‘খতরনাক’ নেশার টানেই এখনও পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার সাপ উদ্ধার করেছেন কালনা শহরের (Kalna City) শ্যামরায়পাড়ার বাসিন্দা দুর্গা বারিক। এলাকার মানুষের কাছে এখন তিনি একরকম ‘মুশকিল আসান’। দুর্গার এই সাহসিকতার কথা এখন এলাকায় মুখে মুখে ফিরছে। আর্থিক সামর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হয়েও স্নাতক হওয়া হয়নি বছর ৩৩–এর দুর্গার। বাবা সদা বারিক ভ্যান চালিয়ে কোনওরকমে সংসার চালালেও এখন আর তেমন কাজ করতে পারেন না।
ফলে সামান্য কিছু কাজ করে মূলত দুর্গার রোজগারেই কোনওরকমে চলছে সংসার। সত্তরোর্ধ্ব প্রতিবেশী জেঠু শিবেন্দ্রনারায়ণ সরকারের সাপ ধরা দেখেই এই নেশার প্রতি আকৃষ্ট হন দুর্গা। মা–বাবাকে বুঝিয়ে জেঠুর সঙ্গে প্রথম দিন সাপ ধরতে গিয়েই ঘটেছিল বিপত্তি। পাঁচ ফুট লম্বা একটি গোখরোর মাথার হাত দেড়েক নীচে ধরে সেটিকে কব্জা করার চেষ্টা করছিলেন দুর্গা। পোড়খাওয়া শিবেন্দ্র তখনই বুঝে যান— দুর্গা যেন একেবারে সাপের গর্তে হাত ঢোকানোর মতো বিপজ্জনক কাজ করতে যাচ্ছেন। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে হাতে থাকা ক্যাচার দিয়ে সাপটির মাথার নীচে ধরে ফেলেন তিনি। গুরু শিবেন্দ্রর অভিজ্ঞতা ও উপস্থিত বুদ্ধিতেই সে যাত্রায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পান শিষ্যা দুর্গা। তবে শেষ পর্যন্ত বিশালাকার গোখরোটিকে জারবন্দি করেছিলেন দুর্গাই। সেখান থেকেই শুরু। তার পর আর থামেননি তিনি।
শিবেন্দ্র বলেন, ‘দুর্গা আমার থেকেও বেশি সাহসী। ওর ক্ষিপ্রতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খুব ভালো। সম্প্রতি কালনার নন্দগ্রামে একটি ইটের পাঁজার মধ্যে থাকা বড় একটি গোখরোকে যে ভাবে ইট সরিয়ে জারবন্দি করেছে, তা আমায় মুগ্ধ করেছে। আমি সঙ্গে যাই, তবে এখন সাপ উদ্ধারের বেশিরভাগ কাজই ও করে।’ তবে সমাজের জন্য এত বড় কাজ করলেও বনবিভাগের সাহায্য সে ভাবে মেলে না বলেই অভিযোগ তাঁদের। সাপ ধরা বা ছাড়ার পুরো প্রক্রিয়াটাই করতে হয় নিজের খরচে। সাপ ধরার পরে আবার নিজেরাই নির্জন জায়গা বা জঙ্গল খুঁজে সেগুলো ছেড়ে আসেন। দুর্গার কথায়, ‘জেঠুকে দেখেই সব শিখেছি। কিন্তু এখন তাঁর বয়স বাড়ছে। তাই এলাকায় জেঠুর ভূমিকাটা পালন করতে চাই।’ তাঁর ইচ্ছে, বন বিভাগে কাজ করার। কিন্তু বর্তমানে তেমন নিয়োগ না–হওয়ায় সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। সুযোগ পেলে বন বিভাগে যোগ দিয়ে এই কাজই করে যেতে চান দুর্গা।