সৌমিত্র ঘোষ, বালি
পুরসভার দায়িত্বে থাকা রাস্তাগুলির সংস্কারের কাজ শুরু হলেও, জিটি রোডের (GT Road) হাল কবে ফিরবে তা জানা নেই কারওর। প্রায় দু’মাস আগে বালি পুরসভার (Bali Municipality) অধীনে ৩৪ কিমি রাস্তার কাজ রাজ্যের পথশ্রী রাস্তাশ্রী প্রকল্পে শুরু হতে চলেছে বলে জানিয়েছিলেন পুরসভার প্রশাসক ও বালির বিধায়ক রানা চট্টোপাধ্যায়। কেএমডিএর (KMDA) অধীনে ওই প্রকল্পে কয়েকটি রাস্তার কাজ শুরু হলেও, অবশিষ্ট রাস্তার কাজ কবে শুরু হবে তা স্পষ্ট নয়। এ দিকে, বালিখাল থেকে জয়সওয়াল হাসপাতাল পর্যন্ত জিটি রোডের হাল গত প্রায় তিন বছর ধরে সঙ্গীন হয়ে উঠেছে।
গত বর্ষায় জিটি রোডের কিছু কিছু অংশে রীতিমতো জলে ডুবে খানাখন্দ তৈরি হলে, ওই সব অংশে পেভার ব্লক বসিয়ে পরিস্থিতি সামলানো হয়। কিন্তু বর্ষার পরে ভারী ট্রাক, কন্টেনার ও অন্য ভারী গাড়ির চাকায় জিটি রোডের অধিকাংশ জায়গায় অ্যাসফল্ট ও খোয়া উঠে বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে। যে কোনও সময়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ভুগছেন পথচারী, বাইক বা সাইকেল আরোহী ও টোটো, অটো চালকরা। অসংখ্য বড়সড় গর্ত তৈরি হয়েছে জিটি রোডের নানা জায়গায়।
উপরন্তু বছর দুয়েক আগে পূর্ত দপ্তরের পক্ষ থেকে জিটি রোডের অনেক জায়গায় রাস্তা মেরামতির উদ্দেশে আর্থ রিমুভার দিয়ে চেঁছে অ্যাসফল্টের উপরের স্তর তুলে ফেলা হয় অপরিকল্পিত ভাবে। রাস্তার উপরের অংশ চেঁছে ফেলার পরেও, অজ্ঞাত কারণে রাস্তার উপরে অ্যাসফল্টের নতুন আস্তরণ বা ম্যাস্টিকের আস্তরণ দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি হাওড়ার এক পদস্থ পূর্ত দপ্তরের কর্তা এ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের ম্যাস্টিক করার প্ল্যান ছিল। কিন্তু ম্যাস্টিকের জন্য যে পদ্ধতিতে বিটুমিন গলিয়ে রাস্তার কাজ করতে হয়, তার উপরে পরিবেশ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই সেই কাজ করা যায়নি। তবে আমরা ভাঙা অংশে পেভার ব্লক বসিয়ে দেবো।’ কিন্তু পূর্ত বিভাগের এই সাফাইয়ে পথচারীদের নিরাপত্তার আশ্বাস মেলেনি বলেই মনে করছেন চালক থেকে বাইক আরোহী সবাই। চেঁছে দেওয়া অংশে দু’চাকা চালাতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করছেন। টোটো ও বাইক চালকরা ভারসাম্য হারাচ্ছেন বলেও অভিযোগ।
এ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে বালি পুরসভার প্রশাসক রানা বলেন, ‘জিটি রোড দেখভালের দায়িত্ব পুরসভার নয়। পূর্ত দপ্তরের দায়িত্ব।’ এ দিকে, বালিখাল থেকে জয়সওয়াল পর্যন্ত অসংখ্য জায়গায় এ ভাবে রাস্তার মধ্যে কাটা অংশে যে কোনও সময়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা। মাত্র এক বছর আগে বেশি রাতে বালি দেওয়ানগাজীর কাছে দৈত্যাকার সিমেন্ট মিক্সিং ডাম্পারের বেপরোয়া ধাক্কায় উল্টো দিক থেকে আসা ট্যাক্সি দুমড়েমুচড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বালির বাসিন্দা, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এক তরুণ ও কলকাতার পার্ক সার্কাসের বাসিন্দা ওই ট্যাক্সির চালকের। জিটি রোডের এমনই একটি কাটা অংশে চাকা পড়ে ডাম্পারের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। দুর্ঘটনাস্থলে থাকা সিসি ক্যামেরায় ছবিতেও তেমন ইঙ্গিত মিলেছিল।
এ ছাড়াও, বালি খাল থেকে শুরু করে অটোস্ট্যান্ড ও মিনিবাস স্ট্যান্ডের কাছে, নিমতলায়, বালি ফায়ার স্টেশনের সামনে, বালি ট্র্যাফিক গার্ড অফিসের কাছে, দেশবন্ধু ক্লাবের সামনে, বাদামতলা, শ্রমজীবী হাসপাতাল, বেলুড় মঠ, হিন্ডালকো কারখানার গেটের সামনে, স্টেট ব্যাঙ্কের সামনে, লিলুয়া বড়গেট— অসংখ্য জায়গায় গর্ত ও কাটা অংশে বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে জিটি রোড। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বেলুড় মঠের উৎসবের দিন সকালে লিলুয়া অগ্রসেন স্ট্রিটের কাছে ফের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাসের নীচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় এক সাইকেল আরোহীর। পুরসভা ও পুর প্রশাসক পূর্ত দপ্তরের উপরে দায় চাপিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও, প্রশাসনের অংশ হিসেবে তাঁরা দায় এড়াতে পারেন না বলে অভিযোগ করছেন বিরোধীরা। রাজ্যে বিধানসভার দিনক্ষণ ঘোষণার আগে জিটি রোডের হাল ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন বাসিন্দাদের।