এই সময়: বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) (SIR) শুরুর সময় থেকেই দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে (Chief Election Commissioner (CEC) Gyanesh Kumar) নিশানা করে আসছে তৃণমূল। তবে বাংলায় এসে সোমবার জ্ঞানেশ প্রশাসনিক বৈঠকে রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে সিইসি–কে বেনজির ভাবে আক্রমণ শাণালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। জ্ঞানেশের নেতৃত্বাধীন কমিশন ইভিএমে (EVM) কারচুপি করার পরিকল্পনা করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন মমতা। অভিষেকের প্রশ্ন, নিউ টাউনে যে হোটেলে বিজেপির তাবড় নেতারা এসে থাকেন, সেই হোটেলেই কেন সিইসি উঠেছেন?
নিউ টাউনে একটি পাঁচতারা হোটেলে সোমবার রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থেকে রাজ্য ও কেন্দ্রের প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশনের ফুলবেঞ্চ। তৃণমূলের অভিযোগ, রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জ্ঞানেশ এই আধিকারিকদের নানা হুমকি দিয়েছেন। তৃণমূলের প্রতিনিধিদলের তিন সদস্য ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, রাজীব কুমারের সঙ্গে সোমবার সকালের বৈঠকে জ্ঞানেশের আচরণ নিয়ে এমনিতেই অসন্তুষ্ট ছিলেন জোড়াফুল নেতৃত্ব। রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের জ্ঞানেশ হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ আসায় মেট্রো চ্যানেলের ধর্নামঞ্চে মমতা বলেন, ‘উনি বলেছেন যে, উনি শুধু এখনই ব্যবস্থা নেবেন না, মে মাসের পরেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। মে মাসের পরে কি আপনার চেয়ার থাকবে? আগে নিজের চেয়ার বাঁচান, তারপরে বাংলার অফিসার এবং মানুষকে হুমকি দেবেন।’ ভোটের ফল প্রকাশের পরেও কিছুদিন নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসন থাকবে। সেই সময় পর্যন্ত রাজ্যের অফিসাররা কমিশনকে ঠিকই সামলে নেবেন বলে মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যে ‘সার’ প্রক্রিয়া চলাকালীন অন্তত ২০০ জন মারা গিয়েছেন বলে তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ। এই মৃত্যুর মিছিল নিয়ে একটি শব্দও জ্ঞানেশ উচ্চারণ না করায় বিস্মিত মমতা। জ্ঞানেশের এই আচরণ নিয়ে মেট্রো চ্যানেলের ধর্নামঞ্চে অভিষেক বলেন, ‘আপনার বিবেক নেই? ২০০ জন মারা গিয়েছেন। ক্ষমা না চেয়ে আপনি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হাত নাড়ছেন! এঁদের মন্যুষত্ব বলে কিছু নেই।’ পাশাপাশি তৃণমূল নেতৃত্ব প্রবল ক্ষুব্ধ রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তারা জ্ঞানেশের বাক্যবাণের সামনে পড়ায়। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের কথায়, ‘সরকারি অফিসারদের ধমকানো–চমকানো হয়েছে। অন্য রাজ্য থেকে...যেমন উত্তরপ্রদেশ থেকে পুলিশ এনে গ্রেপ্তার করাব বলেছেন। জ্ঞানেশবাবু ক্ষমতা থাকলে এটা বাস্তবায়িত করে দেখান।’ জ্ঞানেশকে এই প্রসঙ্গেই মমতার তীব্র কটাক্ষ, ‘যাঁরা অফিসারদের হুমকি দিচ্ছেন, তাঁদের বলে রাখি যে, তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। আমাদের অফিসাররা দু’মাস পরিস্থিতি বিচক্ষণতার সঙ্গে সামাল দেবেন। আপনি নিজেকে স্পাইডারম্যান মনে করেন এবং যা খুশি করতে পারেন বলে ভাবেন?’
তৃণমূলের যুক্তি, রাজ্যের নিয়োগ করা বিএলও থেকে ডিইও— সব স্তরের সরকারি কর্মী ও আধিকারিকরা নির্বাচন কমিশন যখন যে নির্দেশ দিয়েছে, সেই অনুযায়ী কাজ করেছেন। নির্বাচন কমিশন হঠাৎ হঠাৎ নির্দেশ দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সেই সরকারি কর্মীদের জ্ঞানেশ কী ভাবে কাঠগড়ায় তুলতে পারেন— সেই প্রশ্নও তুলেছেন অভিষেক। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতার কথায়, ‘জ্ঞানেশ কুমার বলছেন ডিইও–রা দায়ী। পোর্টাল তো কমিশনের, সফটওয়্যার তো কমিশন তৈরি করেছে, মাইক্রো অবজ়ার্ভার তো কমিশন নিয়োগ করেছে। তা হলে আপনি (জ্ঞানেশ) কী করে রাজ্যের অফিসারদের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন?’ গেরুয়া শিবিরের ইশারায় জ্ঞানেশ ব্রিগেডই ভোটে কারচুপি করার ছক কষছে বলে অভিযোগ করেছেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী নাম না–করে বলেন, ‘ওদের প্রথম পরিকল্পনা হলো নির্বাচনের আগে পর্যন্ত ভোটারদের বাদ দেওয়া। দ্বিতীয় পরিকল্পনা হলো, ইভিএমে কারচুপি করা। আমি আপনাদের সতর্ক করে দিই, গণনার দিন ওরা প্রথমে সেই আসনগুলো দেখাবে, যেগুলোতে বিজেপি এগিয়ে থাকবে। আমরা যে আসনগুলোতে এগিয়ে থাকব, সেগুলো পরে দেখানো হবে।’
নিউ টাউনের যে পাঁচতারা হোটেলে জ্ঞানেশ–সহ কমিশনের ফুলবেঞ্চ রয়েছে সেই হোটেলই আজ, মঙ্গলবার, সাংবাদিক সম্মেলনে করবেন তাঁরা। নির্বাচন কমিশন যে ৬০ লক্ষের বেশি মানুষকে বিচারাধীন বলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় চিহ্নিত করেছে, তাদের মধ্যে কত জন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী— সেই তথ্য এই সাংবাদিক সম্মেলনে জ্ঞানেশকে দিতে হবে বলেও দাবি করেছেন অভিষেক। নির্বাচন কমিশন যদি ‘সার’ প্রক্রিয়ায় কত জন বাংলাদেশি অথবা রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করেছে এই তথ্য দিতে না পারে, তা হলে প্রকাশ্যে জ্ঞানেশ কুমারের ক্ষমা চাওয়া উচিত বলেও মনে করছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। নিউ টাউনের নির্দিষ্ট একটি েবসরকারি হোটেল কেন জ্ঞানেশের পছন্দ হলো, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অভিষেক। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা বলেন, ‘কলকাতায় পাঁচ হাজার হোটেল রয়েছে। কিন্তু অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি থেকে বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা যে হোটেলে এসে থাকেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সেই হোটেলে উঠেছেন। যে ঘরে অমিত শাহ থাকেন, সেই ঘরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন। এটা কি শুধু কাকতালীয়?’ যদিও বিজেপির এক প্রবীণ নেতার পাল্টা বক্তব্য, ‘ওঁদের (তৃণমূলের) নেতারা কোথায় গিয়ে থাকেন, কোথায় কার সঙ্গে বৈঠক করেন— সে সব বলতে গেলে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। কমিশন একটি স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা। তারা যেখানে মনে করেছে, সেখানে আধিকারিকদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। আসলে তৃণমূল ভোটে হারার ভয় পাচ্ছে এখন থেকেই, তাই প্রলাপ বকছে।’
নিউ টাউনের হোটেলে দফায় দফায় বৈঠক করার আগে জ্ঞানেশ এ দিন কালীঘাটে গিয়েছিলেন। জ্ঞানেশের নাম না–করে মমতা এ দিন বলেন, ‘কেউ এক জন মন্দিরে দর্শনে গিয়ে প্রায় পিছলে পড়ে যাচ্ছিলেন। বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ঈশ্বরও হয়তো তাঁর উপরে অসন্তুষ্ট, এটা সম্ভবত তারই লক্ষণ। কেউ আপনাদের ছাড়বে না। আপনারা যদি মনে করেন যে, মানুষকে হুমকি দিয়ে এবং বৈধ ভোটারদের বাদ দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন, কিন্তু বিজেপি যখন ক্ষমতাচ্যুত হবে, তখন আমরা আপনাদের জনগণের আদালতে হাজির করাব।’