• বাঘের লক্ষ্য কাঁধ, কুমিরের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে বেঁচে ফিরেছে মানুষ
    বর্তমান | ১০ মার্চ ২০২৬
  • বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: কার চোয়ালে জোর বেশি? বাঘের নাকি কুমিরের? কার আঘাতের ব্যাপকতা বেশি, গভীর ও মারাত্মক? এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত মাধবনগর গ্রামীণ হাসপাতালের পোড়খাওয়া চিকিৎসকরা। একজন বলছেন, ‘বাঘ’ তো অন্যজন বলছেন, ‘কুমির’। অভিজ্ঞদের বক্তব্য, কুমিরে ধরলে তাও বা বাঁচার আশা থাকে, কিন্তু বাঘের পাল্লায় পড়লে সে আশা ক্ষীণ। হাসপাতালে এসে জখম ব্যক্তি খালি বলতে থাকেন, ‘ডাক্তারবাবু জ্বলে যাচ্ছে!’ এ রাজ্যে বাঘ ও কুমিরের হামলায় জখমদের সবচেয়ে বেশি যে ক’টি হাসপাতালকে চিকিৎসা হয় তার অন্যতম হল দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমার মাধবনগর হাসপাতাল। সুন্দরবনের এ এলাকায় কর্মজীবনে কমপক্ষে ২৫ জন করে বাঘ ও কুমিরের কামড়ের রোগী সামলেছেন কমবেশি প্রত্যেক মেডিকেল অফিসার। বিএমওএইচ’ও জীবনের মেডিকেল অফিসার পর্বে গ্রাউন্ড জিরোতে দাঁড়িয়ে এ কাজই করে গিয়েছেন। এখানে সবচেয়ে বেশি বাঘ ও কুমিরের কামড় খাওয়া মানুষ আসে জি প্লটের কৃষ্ণদাসপুর গ্রাম থেকে। বছরে কমবেশি ৩৫টি এমন মারাত্মক আক্রমণের শিকার রোগী এলে তার মধ্যে ২০-২৫ জনই কৃষ্ণদাসপুরের বাসিন্দা।

    ‘এক মাঝবয়সি মহিলা কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন। কুমিরটা চুপচাপ এসে তাঁর পা টেনে জলের নীচে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। মহিলা একটা গাছ আঁকড়ে জলে তলিয়ে যাওয়া ঠেকাচ্ছিলেন। কিন্তু কুমিরের টেনে ধরায় ফোর্স এতটাই ছিল যে, গাছসুদ্ধ জলের নীচে তলিয়ে যেতে থাকেন মহিলা। এসময় কোনওভাবে কুমিরের চোখদুটো হাতড়ে পেয়ে যান হাতের সামনে। বাঁচার চেষ্টায় চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেন তিনি। কুমির ব্যথায় শেষপর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে দেয়।’

    আবার একটি ঘটনায় ‘ভাগ্যক্রমে মাথা নীচু করায় সদ্য মা এক বাঘিনী মীন ধরতে যাওয়া এক গ্রামবাসীর মাথার উপর দিয়ে লাফিয়ে কার্যত উড়ে যায়। টার্গেট অবশ্য সম্পূর্ণ মিস করেনি সে। চলে যাওয়ার পর দেখা যায়, মানুষটির কান ঝুলছে। মাথার পিছনে গভীর লম্বা ক্ষত’। এমনই সব রুদ্ধশ্বাস ঘটনায় ভরে আছে এই গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসকদের স্মৃতি।

    সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডাঃ শুভদীপ রায় এখানকার কর্মজীবনে বাঘ ও কুমিরের কামড়ে আহত অন্তত ২০-২২ জনের চিকিৎসা করেছেন। তিনি বললেন, ‘কুমিরের কামড়ের ক্ষত অনেক বেশি গভীর। তা থেকেই বোঝা যায় তাঁদের চোয়ালের জোর অনেক বেশি। তবে একটাই বাঁচোয়া, কুমিরের আঘাত সবচেয়ে বেশি হয় মানুষের পায়ে। তাই কখনও কখনও পা হারাতে হলেও, বাঁচার আশা বেশি থাকে। এমনও হয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা করার পর বাড়ি ফিরে গিয়েছেন রোগী।’

    বিএমওএইচ ডাঃ মেহমুদ হাসান শাহ অবশ্য বলেন, ‘অনেক বেশি মারাত্মক বাঘের কামড়ের ক্ষত। বাঘ সবচেয়ে বেশি আঘাত করে কাঁধে। পিঠ, বুকেও থাবার আঘাত পেয়েছি। এমনকী এমনও মৃত মানুষ দেখেছি যাঁর কঙ্কালটি শুধুমাত্র অক্ষত আছে।’ অন্যান্য চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাঘের কামড়ের ২০টি ঘটনা ঘটলে বড়জোর ২-৩ জন শেষপর্যন্ত জীবিত থাকেন। কুমিরের ক্ষেত্রে জীবন বাঁচে অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে।

    চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের সাফ কথা, পাথরপ্রতিমার ঠাকুরাণ নদীর কাছের এই হাসপাতাল থেকে সুন্দরবনের কোর এরিয়া জলপথে লঞ্চে প্রায় দেড় ঘণ্টার দূরত্ব। ঘটনার পর হতদরিদ্র গ্রামবাসীরা জখমকে নিয়ে সকালে নৌকাতে রওনা হলে হাসপাতালে পৌঁছান সন্ধ্যায়। পুরো সময়টা অঝোরে রক্তপাত হয়। তাই ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্স খুব দরকার। আর দরকার আর্থিক পুনর্বাসন। কারণ মানুষটা জখম হলে তাঁর পরিবার খাবে কী? আর মৃত্যু হলে? তখন অবস্থা হবে আরও মারাত্মক। বাঘ বা কুমিরের কামড়ের থেকেও মারাত্মক।
  • Link to this news (বর্তমান)