যোগীর বুলডোজ়ার এ বার পশ্চিমবঙ্গেও! পরিবর্তন যাত্রায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর ‘প্রিয় যানে’ চড়ে মঞ্চে গেলেন সুকান্ত
আনন্দবাজার | ১০ মার্চ ২০২৬
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর নামের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছে বুলডোজ়ারের। যোগী আদিত্যনাথের বদলে অনেকে তাঁকে ‘বুল়ডোজ়ার বাবা’ নামে ডাকতেই বেশি পছন্দ করেন। সেই বুলডোজ়ারের আগমন ঘটল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। এবং বিজেপির হাত ধরেই। রাজ্য জুড়ে বিজেপির যে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ চলছে, তাতে সোমবার বুলডোজ়ারে সওয়ার হয়ে সফর করলেন রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তৃণমূলের সরকারকে বুলডোজ়ার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা গেল সুকান্তকে ঘিরে।
পরিবর্তন যাত্রায় সোমবার বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে সফর করেছেন সুকান্ত। সঙ্গে ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুভাষ সরকারও। সন্ধ্যা নাগাদ সে ‘যাত্রা’ রানিবাঁধ বিধানসভা এলাকায় পৌঁছোয়। সেখানেই বুলডোজ়ার-কাণ্ড মঞ্চস্থ হয়। পরিবর্তন যাত্রার জন্য বিশেষ ভাবে সাজানো যে সব ট্রাকের ব্যবস্থা হয়েছে, সুকান্তেরা তাতেই সফর করছিলেন। তাতে চেপেই তাঁরা রানিবাঁধে পৌঁছোন। কিন্তু জনসভার মঞ্চে পৌঁছোনোর ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার দূরে সুকান্তদের সে বাহন থেমে যায়। স্থানীয় বিজেপি কর্মীরাই থামিয়ে দেন। বুলডোজ়ারে চড়ে সভামঞ্চ পর্যন্ত যেতে হবে, নেতাদের সামনে আবদার জোড়েন কর্মী-সমর্থকেরা। তাঁরা বুলডোজ়ার এনে সাজিয়েও রেখেছিলেন আগে থেকেই। কর্মীদের দাবি মেনে ট্রাক থেকে নেমে বুলডোজ়ারেই চড়েন সুকান্ত। সঙ্গী হন সুভাষ-সহ অন্যেরাও।
পরিবর্তন যাত্রার জন্য যে গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার সামনে এসে নেতারা পাশাপাশি পাঁচ-ছ’জন মিলে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু বুলডোজ়ারে সে ব্যবস্থা নেই। তাই বুলডোজ়ারের সামনে যে চওড়া বেলচার মতো অংশ থাকে, তার মধ্যেই উঠে দাঁড়ান কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও উত্তর-পূর্ব উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। বেলচা প্রশস্ত হওয়ায় বাকিরাও সেখানে উঠে সুকান্তের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়েন। রাস্তায় জড়ো হওয়া বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা যাতে সহজেই নেতা-মন্ত্রীদের দেখতে পান, তা নিশ্চিত করতে বেলচাকে একটু উপরের দিকে ঝুলিয়ে রেখেই মঞ্চের দিকে এগোতে শুরু করে বুলডোজ়ার। আধ কিলোমিটারের কিছুটা বেশি পথ এমন অভিনব উপায়ে অতিক্রম করে মঞ্চের কাছে পৌঁছোন বিজেপি নেতারা। তার পরে মঞ্চে উঠে জনসভা শুরু করেন।
উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগীর ‘বুলডোজ়ার নীতি’ গোটা দেশে চর্চিত বিষয়। অপরাধী এমনকি, অভিযুক্তদেরও বাড়িঘর বা অন্যান্য সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দিতে বুলডোজ়ার পাঠিয়ে দেওয়াকে প্রায় সরকারি নীতিতে পরিণত করে ফেলেছেন যোগী। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁর সে নীতি জনসমর্থন পেয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই বুলডোজ়ার প্রয়োগের সিদ্ধান্ত সমালোচিত হয়েছে। কখনও কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি কলকাতা পুরসভাকে অবৈধ নির্মাণ ভাঙার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘দরকার পড়লে যোগী আদিত্যনাথের থেকে কিছু বুলডোজ়ার ভাড়া করুন।’’ আবার কখনও সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে এই ‘বুলডোজ়ার নীতি’র বিরুদ্ধে। কিন্তু কোনও কিছুই যোগীকে বিচলিত করতে পারেনি। তিনি নিজের নীতিতে অনড় থেকে গিয়েছেন।
যোগীর দেখানো পথে একে একে হাঁটতে শুরু করেছে বিজেপি-শাসিত অন্যান্য রাজ্যের প্রশাসনও। উত্তরাখণ্ড হোক বা মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত হোক বা অসম, একের পর এক রাজ্যে প্রশাসন বুলডোজ়ার ব্যবহার করেছে কঠোর পদক্ষেপের দৃশ্যপট তৈরি করতে। যে সব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, সেখানেও দলের কর্মী-সমর্থকেরা নানা বিষয়ে বুলডোজ়ার প্রয়োগের দাবিতে সরব হয়েছেন। বিজেপির জনসংযোগ কর্মসূচিতে কেউ কেউ বুলডোজ়ার নিয়ে হাজির হয়েছেন। এ বার সেই দৃশ্য পশ্চিমবঙ্গেও তৈরি হল। যোগীর ‘প্রিয়’ বুলডোজ়ারে চাপিয়ে রাজ্য বিজেপির নেতাদের মঞ্চে পৌঁছে দিলেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা।
রানিবাঁধের জনসভার মঞ্চ থেকে সুকান্ত সোমবার আরও একটি দৃশ্যপটের জন্ম দিয়েছেন। পয়সা জমানোর মাটির ভান্ডার হাতে নিয়ে মঞ্চে উঠেছেন। তার গায়ে সাদা কাগজ চেটানো। ছাপার অক্ষরে লেখা ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার – ৩০০০ টাকা’। যে প্রতিশ্রুতি এত দিন মৌখিক ছিল, এ বার তাকে মূর্ত করে তুলে ধরার চেষ্টা করলেন সুকান্ত। ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্য ১৫০০ টাকার বদলে বিজেপি যে ৩০০০ টাকা করে ভাতার বন্দোবস্ত করবে, সে কথা আগের চেয়েও জোর দিয়ে বলতে পদ্মশিবির কতটা তৎপর, রানিবাঁধের জনসভায় তা স্পষ্ট হল।