এই সময়: ইরান এবং ইজ়রায়েল–আমেরিকার যুদ্ধ (Iran vs USA-Israel War) পরিস্থিতির আবহে ৪৮ ঘণ্টা আগেই দেশজুড়ে বেড়েছে গেরস্থালি ও বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম (Commercial LPG Cylinder Price)। এরপরে কি আরও দুশ্চিন্তার সময় আসছে? রবিবার রাত থেকে ইঙ্গিতটা অন্তত তেমনই। কারণ, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির পাশাপাশি এলপিজি (LPG) ডিলারদের কাছ থেকে জানা গিয়েছে, বাণিজ্যিক গ্যাসের সিলিন্ডার সরবরাহের উপরে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাগাম টানছে তেল সংস্থাগুলি। অর্থাৎ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, কারখানার মতো যে সব জায়গায় বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ হয়, সেগুলি আপাতত সরবরাহ করা হবে না। এর মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
অর্থাৎ, রোগীদের জন্য খাবার এবং স্কুল (মূলত বেসরকারি), কলেজ ক্যান্টিন, ল্যাবরেটরি বাদে কোনও জায়গাতেই আপাতত চাহিদামতো বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করা হবে না। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, কমার্শিয়াল এলপিজি-র চাহিদা দেশের মোট চাহিদার মাত্র ২-৩ শতাংশ। কিন্তু এই সামান্য অংশে লাগাম পরানো হলেও অর্থনৈতিক ভাবে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর জেরে হোটেল, রেস্তোরাঁর রোজকার ব্যবসায় বড় রকমের ধাক্কা লাগতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই সব জায়গায় খাবারের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। কিছু কিছু শিল্প ক্ষেত্রেও এর বড় রকম প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
পশ্চিম এশিয়াজুড়ে যুদ্ধ (War In West Asia) পরিস্থিতির জেরে ইরান হরমুজ় প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচল আটকে দিয়েছে। ফলে সার্বিক ভাবে তেল ও গ্যাস আমদানিতে বড়সড় প্রভাব পড়েছে। সূত্রের দাবি, ভারতের লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) (LNG) সরবরাহের ক্ষেত্রে অন্তত ৬০ শতাংশই আমদানি হয় হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। আবার লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি হয় মূলত সৌদি আরব থেকে। ভারতের মোট চাহিদার ৮০–৮৫ শতাংশ এলপিজি আসে হরমুজ় প্রণালী হয়েই। তাই হরমুজ় প্রণালী আটকে পড়ার জেরে স্বাভাবিক ভাবে সেই আমদানিও ধাক্কা খাচ্ছে। দিন কয়েক আগে কেন্দ্রের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, ভারতে এখনও যে পরিমাণ তেল মজুত আছে, তাতে শক্তিক্ষেত্রে দৈনন্দিন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় কোনও ফারাক নেই।
ফলে গ্রাহকদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তারপরেই গেরস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম সিলিন্ডার প্রতি ৬০ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১১৪.৫০ টাকা বেড়ে গিয়েছে। এ নিয়ে জনমানসে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অসুবিধায় পড়েছেন বিশেষ করে মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা। রাজনৈতিক দলগুলিও এ নিয়ে সরব হয়েছে। অনেকেই আতঙ্কে গ্যাস সিলিন্ডার আগেভাগে বুক করা শুরু করেছেন। এর জেরেই দৈনন্দিন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটা বড় ফারাক তৈরি হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। তার জন্যই আপাতত বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে রাশ টানা হচ্ছে বলে খবর এলপিজি ডিলারদের সূত্রে। ডিলার ও তেল সংস্থার আধিকারিকদের অনেকের কথায়, ‘কোভিডের সময়ে, এমনকী এর আগে ইরাক যুদ্ধের সময়েও এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।’
সূত্রের খবর, কলকাতা ও লাগোয়া জেলাগুলি মিলিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ২–৩ লক্ষ বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়। সেই সরবরাহটা আপাতত স্থগিত হলে এলপিজির উপরে নির্ভরশীল বিপুল সংখ্যক শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যে সমস্যায় পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এলপিজি ডিলারদের বক্তব্য, সোমবার পর্যন্ত তাঁদের কাছে লিখিত নির্দেশিকা না–এলেও আপাতত গেরস্থালির সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের যাতে সমস্যায় না–পড়তে হয়, সেই কারণেই এই সিদ্ধান্ত। কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা ও আশপাশের এলাকা মিলিয়ে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির গ্রাহকের সংখ্যা এক কোটির বেশি। এর মধ্যে শুধু ইন্ডিয়ান অয়েলের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪১ লক্ষ।
সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে এক লক্ষের মতো ডোমেস্টিক এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়। ডিলার সংগঠনের এক কর্তার বক্তব্য, ‘হরমুজ় প্রণালী নিয়ে আন্তর্জাতিক টেনশন এবং দামবৃদ্ধির জেরে সাধারণ মানুষ এতটাই চিন্তায় রয়েছেন যে শনিবার এই দৈনিক ডোমেস্টিক এলপিজি সিলিন্ডারের চাহিদা দাঁড়ায় দেড় লক্ষের মতো। রবিবার আবার এই চাহিদা পৌঁছে যায় ১.৯ লক্ষ সিলিন্ডারে। যেখানে সাধারণত দৈনিক চাহিদা এক লক্ষের আশপাশে থাকে। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণে সাধারণ মানুষের ডোমেস্টিক এলপিজি বুকিংয়ের চাহিদা আগামী কিছু দিন আরও বাড়তে পারে।’ শুধু তা–ই নয়, কর্মাশিয়াল গ্যাস সরবরাহ থমকে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে বাণিজ্যিক গ্যাস ব্যবহারকারীরাও এখন অনেকে ডোমেস্টিক সিলিন্ডার বুক করছেন বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অনেকের। ফলে গত দু’দিনে ডোমেস্টিক এলপিজির চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে। সূত্রের খবর, সেই চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডোমেস্টিক সিলিন্ডার সরবরাহ করা কঠিন হবে বলেই আপাতত স্থগিত রাখতে হচ্ছে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের সরবরাহ।
তবে তাতেও যে সাধারণ মানুষের জন্য কোনও বিরাট স্বস্তি থাকবে, এমনটা মনে করছেন না অনেকেই। কারণ, বড় হোটেল–রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ হয়তো কিছু দিনের জন্য তাদের স্টক সিলিন্ডার থেকে কাজ চালিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু ছোট–মাঝারি হোটেল–রেস্তোরাঁ বা ফুটপাথের পাইস হোটেল সর্বত্রই ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়বেন। সূত্রের খবর, আসানসোল–দুর্গাপুর–বার্নপুর শিল্পাঞ্চলের বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজেও বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে। ‘হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’র তরফে সুদেশ পোদ্দার সোমবার বলেন, ‘আমাদের কাছে এখনও লিখিত কোনও নির্দেশিকা আসেনি। তবে আমরাও জানতে পেরেছি, নন–ডোমেস্টিক রিফিলিং ও সরবরাহ আপাতত বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, এটা পুরোপুরি বন্ধ না–করে দিয়ে অন্তত মাসিক চাহিদার ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ সরবরাহ করা হোক। বাকিটা আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ম্যানেজ করার চেষ্টা করব।’
এই সংগঠনের আওতাধীন হাজার দেড়েকের মতো হোটেল–রেস্তোরাঁ মালিক আছেন রাজ্যে। তার বাইরেও সব মিলিয়ে ৪০ হাজারের মতো হোটেল–রেস্তোরাঁ রাজ্যে আছে। অসংগঠিত ক্ষেত্র ধরলে সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। ফলে এই সমস্যাটা কতটা গভীর, সেটা স্পষ্টই। যদিও শহরের একটি নামী হোটেল চেনের তরফে বলা হয়েছে, ‘বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের উপরে কোনও সরকারি নিষেধাজ্ঞা নেই। একটি সরকারি নির্দেশিকার জন্য কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।’ তবে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস মন্ত্রকের তরফে ৫ মার্চের নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘পরবর্তী নির্দেশ না–আসা পর্যন্ত সব রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি শুধুমাত্র গেরস্থালির ব্যবহারকারীদের জন্য এলপিজি সংগ্রহ ও বিপণন করবে।’
একাধিক তেল কোম্পানির তরফে জানা গিয়েছে, সরাসরি বাণিজ্যিক সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ রাখার কথা নির্দেশিকায় না–বলা হলেও হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে সেই বার্তা এসে গিয়েছে। ফলে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল ইতিমধ্যে এই পথে হেঁটেছে। হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম ও ভারত পেট্রোলিয়ামও একই পথে হাঁটতে চলেছে বলে সূত্রের দাবি। কেন্দ্রের নির্দেশিকার মধ্যে ধোঁয়াশা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইসকো–র এগজ়িকিউটিভ ডিরেক্টর সঞ্জীবকুমার সিং এ দিন বলেন, ‘আমাদের ১০০ টন মতো কমার্শিয়াল গ্যাস লাগে। এ দিন পর্যন্ত কোনও রেস্ট্রিকশনের কথা সরকারি ভাবে বলা হয়নি। তবে আমরাও বিষয়টির উপরে নজর রাখছি এবং কথা বলছি।’ এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সূত্র দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, আলজিরিয়ার সরকারি তেল ও গ্যাস সংস্থার কাছ থেকেও গ্যাস আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ক্যানাডা থেকেও এলপিজি আনার প্রক্রিয়া চলছে।