• শুধু ধ্বংসাবশেষ নয়, ইতিহাসের ফিসফাস, ডালিম ও ধামসাং দুর্গ সংরক্ষণের কাজ শুরু
    এই সময় | ১০ মার্চ ২০২৬
  • সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার

    স্মৃতি কি সুখের? নাকি বেদনার। উত্তরবঙ্গের কালিম্পংয়ে (In Kalimpong, North Bengal) থাকা ডালিম ফোর্ট এবং ধামসাং ফোর্ট (Dalim Fort and Dhamsang Fort) ঘিরে রয়েছে রাজার হত্যার স্মৃতি, সাম্রাজ্য পতনের করুণ কাহিনি। পাহাড়ি অরণ্যের গভীরে শেওলা ধরা পাথরের গায়ে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে। ডালিম ফোর্ট ও ধামসাং ফোর্ট শুধু ধ্বংসাবশেষ নয়-এ এক নিঃশব্দ ইতিহাস।

    ৩৬১ বছর আগে কালিম্পং জেলার এই অঞ্চল তখন লেপচা রাজার (Lepcha King) সাম্রাজ্যের অধীনে। পাহাড়ের মাথায় ধামসাং, নীচে ডালিম। দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। দুই দুর্গ যেন তিস্তা উপত্যকার প্রহরী। উত্তরের বড় নদী তিস্তার অধিকার থেকে ভুটান ছিল বঞ্চিত। লেপচা রাজ্যের সীমানা ছুঁয়ে বয়ে চলত তিস্তা। সেই কারণে লেপচা সাম্রাজ্য দখল করার স্বপ্ন বহুদিন ধরেই দেখছিলেন ভুটানের রাজা ডুকপা নামগিয়াল। সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন লেগচা রাজা গেবু আচিওক। বারবার আক্রমণ করেও ব্যর্থ হয়ে ভুটানের রাজা ১৬৭১-এ (মতান্তরে ১৬৭৬) বিশেষ দূত পাঠিয়ে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দেন। এ চুক্তি বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে লেপচা রাজাকে জানিয়েছিলেন রানি নালিমিত। তবু রাজা গিয়েছিলেন বৈঠকে।

    আলোচনা, আপ্যায়ন, মদ্যপান সবই চলছিল নিয়ম মতো। কিন্তু সেই আপ্যায়নের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। অচেতন অবস্থায় গেবু আচিওকের মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়। ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন ভুটানের সেনা কমান্ডার অ্যাশক ভুগে। কাটা মুণ্ড ও দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় চেল নদীতে। সেই থেকে লেপচাদের কাছে চেল 'ভুটে দাহা' বা শোকের নদী। রাজা নেই, সেনারা বন্দি। দুই দুর্গ দখল করে ভুটানিরা। প্রায় দু'শো বছর পরে ডালিম ফোর্ট এবং ধামসাং ফোর্ট-এর দখল নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ব্রিটিশ আমলেও এই পাহাড় শান্ত ছিল না। গোলাবারুদের বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ছ'জন সেনা। সেই স্মৃতিফলক আজও পড়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। আজও দুর্গে গেলে কষ্ট করে কল্পনা করতে হয় তার প্রাচীন রূপ। অরণ্যের গাঢ় সবুজে ঢেকে গিয়েছে অতীতের প্রাচীর। কোথাও ইটের গায়ে শেওলা, কোথাও বুনো লতার জট। বাতাসে ভেসে বেড়ায় অদৃশ্য কণ্ঠস্বর, এক হারানো সাম্রাজ্যের আর্তি। লেপচা জনজাতির কাছে এই দুর্গ শুধুই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, আত্মপরিচয়ের অংশ।

    ২০১২-য় গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ মায়েল লিয়াং লেপচা ডেভেলপমেন্ট বোর্ড। প্রাক্তন চেয়ারম্যান এলএস তামসাং রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের কাছে চিঠি লিখে এই দুর্গ দু'টি রক্ষা করতে আর্জি জানান। লেপচা ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের মেম্বার সেক্রেটারি ভূষণ শেরপা বলেন, 'ইতিমধ্যে কমিশনের টেকনিক্যাল টিম ডালিম এবং ধামসাং দুর্গ পরিদর্শন করে গিয়েছে। এই দুর্গ দু'টিকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লেপচা জনজাতির মানুষজন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।' কালিম্পংয়ের বিধায়ক রুদেন নিজেও লেপচা জনজাতির মানুষ। এই দুর্গকে রক্ষা করা নিয়ে তাঁর আবেগ রয়েছে। তিনি বলেন, 'এখন নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। সাত কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। হেরিটেজ কমিশনের পরামর্শে সেই কাজ হবে।'

    এই ভাঙা গড়ের সামনে দাঁড়ালে উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুধু মনে হয়, ইতিহাস মুছে যায় না। ইট ভাঙে, প্রাচীর ধসে পড়ে, কিন্তু রক্তের দাগ থেকে যায় মাটির গভীরে। আর সেই দাগই হয়তো আগামী প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে এই পাহাড় একদিন এক রাজার, এক জাতির গর্ব ছিল। উত্তরের বিখ্যাত ভূপর্যটক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, 'লেপচা এবং ভুটান রাজারা তাদের সাম্রাজ্যের দুর্গম এলাকায় এই ধরনের দুর্গ নির্মাণ করতেন। কারণ অগম্য ও দুর্গম এলাকার সুযোগে শত্রুরা যাতে ঢুকে পড়তে না পারে সে জন্য উঁচু থেকে নজরদারির ব্যবস্থা করা হতো। এবং দুর্গের ভেতরে অন্তত মাস খানেকের রসদের বন্দোবস্ত থাকত।

  • Link to this news (এই সময়)