• রাজায়-রাজায় যুদ্ধে নিষিদ্ধ একাধিক অস্ত্র, জানেন কোনগুলি?
    এই সময় | ১১ মার্চ ২০২৬
  • তেলে চুবিয়ে এক বিশালাকৃতির লাল কাপড় ছুড়ে দেওয়া হলো শত্রুদের দিকে। তখনও কেউ আঁচ করতে পারেননি ঠিক কী হতে চলেছে। এর পরেই শুরু হলো ডগায় আগুন লাগানো বাণ নিক্ষেপ। মুহূর্তে পুড়ে ছাই বিপক্ষের একের পর এক সেনা। বিখ্যাত ‘বাহুবলী’ সিনেমার কথা মনে পড়ছে সকলের। একসঙ্গে অধিক মানুষকে হত্যার নানা কৌশল পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের সঙ্গে। ‘সূচাগ্র মেদিনী’ না দেওয়ার লড়াইয়ে বদল হয়েছে অস্ত্রেরও। বর্তমান যুগে বিশ্বের নয়টি দেশের হাতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র। অনেক দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অপেক্ষায়। জাপানের ভয়াবহতার কথা মাথায় রেখে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পথে হাঁটেনি কোনও দেশই। তবে পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াও যে কোনও সংঘাতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে আরও একাধিক মারণাস্ত্রের ব্যবহারে।

    ‘নিষিদ্ধ’ অস্ত্র ব্যবহারের আলোচনা শুরু হয়েছে চলমান ইরান এবং ইজরায়েল-আমেরিকার সংঘাতকে কেন্দ্র করে। কারণ ‘Human Rights Watch’ নামে একটি সংগঠন দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে ‘হোয়াইট ফসফরাস’ ব্যবহার করেছে ইজ়রায়েল। ভয়ঙ্কর এই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কেন এটি ব্যবহার হলো, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু। এইরকম আরও কিছু অস্ত্রের ব্যবহার ‘Not to be Applicable’ যুদ্ধে। কী সেগুলি?

    নাপাম (NAPALM) : নাপাম-এর কথা বলতেই প্রথমে মনে পড়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই বিখ্যাত ছবির কথা। এক নগ্ন নাবালিকা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে চলেছে রাস্তার উপরে। ১৯৪২ সালে আমেরিকা তৈরি করে এই অস্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। নাপাম বলতে পেট্রল বা ডিজেলের মতো পেট্রোরসায়ন এবং বিভিন্ন 'জেল-সৃষ্টিকারী উপাদানের' (gelling agents) একটি মিশ্রণকে বোঝায়। এটি মূল জ্বালানিকে আরও বেশি আঠালো করে তোলে। ফলে কোথাও এর ছোঁয়া লাগলে সেখানে আঠার মতো আটকে তা জ্বালিয়ে দেয়।

    রাসায়নিক অস্ত্র: যে কোনও সংঘাতে কেমিক্যাল ওয়েপন ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে এর ভয়াবহতার জন্য। নোভিচক, সারিন, মাস্টার্ড গ্যাস, ক্লোরিন এবং ফসজিনের মতো কেমিক্যাল এজেন্টগুলি অস্ত্রে ব্যবহার করা যায় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৭৯-১৯৮৯ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন ব্যাপকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন এবং পরে ইরাকে কুর্দি ও শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধেও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৯৩ সালের রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের অধীনে এই রাসায়নিকের উৎপাদন, ব্যবহার এবং মজুদ নিষিদ্ধ করা হয়।

    ক্লাস্টার মিউনিশন: ক্লাস্টার মিউনিশন নামটি থেকেই বোঝা যায়, এই যুদ্ধাস্ত্র এক জায়গায় নিক্ষেপ করা হলে এটি ভাগ হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্লাস্টার মিউনিশনও বিশাল এলাকা জুড়ে কয়েক ডজন বা কয়েকশো বোমলেট ছড়িয়ে দেয়। এটি যুদ্ধ বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। সাধারণত বিমানঘাঁটি ও সেনাদলের ঘাঁটি এক সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়ার জন্যে এটি ব্যবহৃত হয়। ২০০৮ সালের 'অসলো কনভেনশন'-এ এই অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। কারণ, এই অস্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া বোমলেটগুলি অনেক সময়ে ফাটে না। সেগুলি পরে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করতে পারে।

    বায়োলজিক্যাল অস্ত্র: বায়োলজিক্যাল বা জৈব অস্ত্র একসঙ্গে বিশাল সংখ্যক মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে সক্ষম। প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পোকামাকড় এবং ছত্রাক ব্যবহার করে নিঃশেষ করে দেওয়া হয় বিস্তীর্ণ এলাকার জনজাতিকে। ১৯৭২ সালের Biological Weapons Convention-এ এই অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জৈব অস্ত্রের উৎপাদন, সংগ্রহ, হস্তান্তর, মজুদকরণ এবং ব্যবহারকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়।

    এক্সপ্যান্ডিং বুলেট: আগে যুদ্ধে একটি বুলেট ব্যবহার হতো। একটি বুলেট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরে সেখানে এক্সপ্যান্ড করত বা ছড়িয়ে পড়ে। ফলত, কয়েকগুণ বেশি ক্ষতি হতো। ১৮৯৯ সালে হগ কনভেশনে এই বুলেট ব্যবহার বন্ধ করা হয়। যদিও শিকার বা অন্য কিছু ক্ষেত্রে এই বুলেট এখনও ব্যবহার হয়।

    অ্যান্টি-পার্সোনাল ল্যান্ডমাইন: অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন তৈরি হওয়ার আগে এই ধরনের ল্যান্ডমাইন প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হতো। এগুলো সাধারণত প্লাস্টিক ও কাঠের মতো অ-ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হয়, যাতে চিহ্নিত না করা যায়। বড় ক্ষতি না হলেও সাময়িক ক্ষতির জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৭ সালের 'অটোয়া চুক্তি'-র আওতায় এগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যুদ্ধের পরেও সাধারণ মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকায় এটি ব্যবহার বন্ধ করা হয়।

  • Link to this news (এই সময়)