• ফেলুদার ৬০ বছরে স্পেশ্যাল ডাকটিকিট ডিজ়াইন স্কুলছাত্রীর
    এই সময় | ১১ মার্চ ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    এক দিকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল আর অন্য দিকে ফেলুদা। এ ভাবেই ভারতীয় পোস্ট অফিসের ‘ফিলাটেলিক ব্যুরো’–র কাছে বিশেষ এক ডাকটিকিট তৈরির প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল খিদিরপুর সেন্ট টেরেসা স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্রী রূপকথা দাশগুপ্ত। সেই ডিজ়াইন অ্যাপ্রুভড হতে সময় লাগেনি। ‘মাই স্ট্যাম্প’ বিভাগ ১২টি ডাকটিকিটের একটি সেট তৈরি করে দিয়েছে রূপকথাকে। বাংলা সাহিত্যের জগতে আত্মপ্রকাশের ৬০ বছর পরে বাংলা সাহিত্যর অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র ফেলুদাকে এই ভাবেই ‘ট্রিট’ দিল স্কুলছাত্রী। ফেলুদাকে নিয়ে ডাকটিকিট তৈরির পরিকল্পনা এসেছিল আইসিএসই পরীক্ষার ঠিক আগে। কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যেও ‘হিরো’–র জন্য এইটুকু তো করাই যায়!

    ‘বন্ড, জেমস বন্ড’ — ১৯৬২–র ৫ অক্টোবর প্রথম রুপোলি পর্দায় শোনা গিয়েছিল সংক্ষিপ্ত এই পরিচয়বাক্য। ৬৪ বছর পার হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ব্রিটিশ ইনটেলিজেন্স এমআই–সিক্স–এর কাল্পনিক এই গুপ্তচরের জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নমুখী হওয়ার লক্ষণ নেই। গত সাড়ে ছ’দশকে হলিউডের ছ’জন ডাকসাইটে নায়ককে দেখা গিয়েছে বন্ডের ভূমিকায়। কাল্পনিক এই চরিত্রের জনপ্রিয়তা যে কতটা, সেটা বোঝা যায় ২০২২–এ রয়্যাল মেল–এর একটি কাজে। সেটা ছিল জেমস বন্ডের পর্দায় আসার ৬০ বছর পূর্তি। বছরটাকে স্মরণীয় রাখতে রয়্যাল মেল জেমস বন্ডকে নিয়ে একাধিক স্পেশ্যাল সেট প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে একটি সেট–এ ছিল বিভিন্ন বন্ডের ব্যবহার করা গাড়ি এবং অন্য সেট–এ দেখা গিয়েছিল প্রথম বন্ডের ভূমিকায় অভিনয় করা শন কোনারি থেকে বর্তমান বন্ড ড্যানিয়েল ক্রেগ পর্যন্ত প্রত্যেককে।

    আচার–আচরণে জেমস বন্ড না হলেও বাঙালির কাছে ফেলুদা–র অ্যাপিল বরাবরই অন্যরকম। বন্ডের পছন্দের পানীয় মার্টিনি — ‘শেকেন, নট স্টারড’। ফেলুদা চারমিনারেই সন্তুষ্ট। ডিনারের পরে খয়ের ছাড়া একটা পান হলে তো কথাই নেই। ক্ষুরধার মগজাস্ত্রর অধিকারী আদ্যোপান্ত বাঙালি এই গোয়েন্দারও সাহিত্যজগতে আবির্ভাবের ৬০ বছর পার হয়ে গিয়েছে। ১৯৬৫–তে সন্দেশ পত্রিকায় ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ গল্প দিয়ে রহস্যের সমাধান শুরু করেছিল ফেলুদা। পর্দায় আসার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সাহেবরা যদি জেমস বন্ড–কে নিয়ে নিয়ে ডাকটিকিট বার করতে পারে, তা হলে বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় আইকন ফেলুদাই বা কেন বঞ্চিত থাকেন!

    রূপকথার কথায়, ‘অনেক ভেবে আমার মনে হয়েছিল যদি ফেলুদাকে নিয়ে একটা ডাকটিকিট করা যায়, তা হলে কেমন হয়? কিন্তু এমন কি আদৌ করা যায়? সেটা জানতেই কথা বলতে গিয়েছিলাম জিপিও–তে। সেখানেই শুনি ‘মাই স্ট্যাম্প’ নামে ওই বিভাগের কথা।’ জিপিও–র ফিলাটেলি বিভাগ অর্থাৎ ডাকটিকিট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকরা ‘এই সময়’–কে বলেন, ‘মাই স্ট্যাম্প হলো ডাকবিভাগের বিশেষ একটি উদ্যোগ। এখানে আমাদের একটা আগে থেকেই তৈরি করা ফর্ম্যাট আছে। যদি কেউ নিজের ডিজ়াইন করা কোনও ছবি নিয়ে আসে এবং সেই ছবি অনুমোদন করা হয়, তা হলে সেই ফর্ম্যাট অনুযায়ী আমরা ডাকটিকিট বানিয়ে দিই।’ ফিলাটেলিক ব্যুরো জানিয়েছে, কোনও জীবিত বা বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি দিয়ে ডাকটিকিট তৈরি করাতে হলে বিশেষ অনুমতি লাগে। কিন্তু কাল্পনিক চরিত্র বা প্রাকৃতিক দৃশ্য ব্যবহার করা হলে অনুমতি লাগে না। ৩০০ টাকার বিনিময়ে ডাকবিভাগ ১২টি ডাকটিকিটের একটি সেট বানিয়ে দেয়।

    সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের নিয়ে অতীতে বহু প্রদর্শনী হয়েছে। কিন্তু ফেলুদা–কে নিয়ে ডাকটিকিট— তা–ও এক স্কুলপড়ুয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগে! এমন খবরে রীতিমতো অবাক সন্দীপ রায়। তিনি বলেন, ‘এমনটা যে হয়েছে আমি জানতাম না। আমি ওই ডাকটিকিট এখনও দেখিনি, কিন্তু দেখার ইচ্ছা রইল। রূপকথাকে আমার শুভেচ্ছা।’ যে ঘরে বসে ফেলুদা–র স্রষ্টা লেখালেখি করতেন, যে ডেস্কে বসে তাঁর বিখ্যাত খেরোর খাতায় অজস্র স্কেচ করেছেন সত্যজিৎ রায় — ফেলুদা স্ট্যাম্প দেখাতে গিয়ে হয়তো এ বার সেই ঘরটা দেখার সুযোগ পাবে রূপকথা। আপাতত অপেক্ষা পরীক্ষাটা শেষ হওয়ার।

  • Link to this news (এই সময়)