এই সময়: এই উইক এন্ডে রেস্তোরাঁয় বিরিয়ানি, চাঁপ খাওয়ার প্ল্যান আছে? আশ মেটাতে হতে পারে তন্দুরি চিকেন খেয়ে। চিকেন বাটার মশালা অর্ডার দিলে হয়তো, রেস্তোরাঁ সাফ জানিয়ে দেবে, পাওয়া যাবে না। বদলে মিলবে চিকেন টিক্কা। পরিস্থিতি যে দিকে এগােচ্ছে, তাতে অচিরেই হয়তো ট্রেডমার্ক ডিশ সার্ভ করাই বন্ধ করে দেবে শহরের প্রথম সারির হোটেল, রেস্তোরাঁগুলি। সৌজন্যে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে তৈরি হওয়া জ্বালানি সঙ্কট!
ইরানে সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে দেশ জুড়ে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সিলিন্ডার সরবরাহের উপরে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাগাম টেনেছে তেল সংস্থাগুলি। ঠিক হয়েছে, হোটেল, রেস্তোরাঁ, কারখানার মতো যে সব জায়গায় বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ হয়, তা আপাতত বন্ধ থাকবে। স্বাভাবিক ভাবেই এর প্রভাব পড়েছে দেশের হোটেল ও রেস্তোরাঁ ক্ষেত্রে। গ্যাস বাঁচাতে মেনুতে কাটছাঁট করছে শহর কলকাতার একাধিক প্রথম সারির রেস্তোঁরা। যে সব খাবার তৈরিতে গ্যাস বেশি লাগে, সেগুলি বন্ধ করে জোর দেওয়া হচ্ছে তন্দুর আইটেমের উপরে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার বাড়ছে ইন্ডাকশনের। দেশ জুড়ে তৈরি হওয়া জ্বালানি সঙ্কটের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
মেট্রো চ্যানেলে ধর্নামঞ্চ থেকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির জন্য মোদীর সমালোচনা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, 'গ্যাস বেলুনের মতো নিজের পাবলিসিটি না করে, গ্যাসের দাম কমান। এত পাবলিসিটি না করে, সেই টাকা তো ভর্তুকি হিসেবে দিতে পারেন। এই ভর্তুকি দিলেও গ্যাসের দাম এক টাকা কিংবা পাঁচ টাকাও কমত।' মমতার প্রশ্ন, 'মনমোহন সিংয়ের সময়ে গ্যাসের দাম ৪০০ টাকা ছিল। তার পরে কত বার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছেন? এ বার কি পেট্রল–ডিজ়েল?'
গ্যাস সঙ্কটের প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে এ রাজ্যেও। কলকাতার খ্যাতনামা এক রেস্তোরাঁ চেনের সিইও বলেন, 'আমাদের দু'দিনের মতো রান্নার গ্যাস মজুত রয়েছে। গ্যাস খরচ কমানোর জন্য আমরা মেনু বদলাচ্ছি। জোর দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক ওভেন ও ইন্ডাকশনের ব্যবহারের উপরে।' তবে এ ভাবে কত দিন চালানো যাবে, তা নিয়ে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় তিনি। শহরের আরও দুই প্রথম সারির রেস্তোরাঁর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কথায়, 'অন্য মেট্রো শহরগুলিতে ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করেছে। কলকাতার পরিস্থিতি এখনও ততটা খারাপ না হলেও বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত হতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি থাকলে আমাদেরও মেনু কাটছাঁটের পথে যেতে হবে।'
সমস্যায় ব্যারাকপুরের স্টেশন লাগোয়া খ্যাতনামা একটি বিরিয়ানি চেনও। ব্যারাকপুরে দু'টি এবং সোদপুরে একটি আউটলেট রয়েছে এই চেনের। তিনটি আউটলেটে দিনে ২৮-৩০টি বাণিজ্যিক সিলিন্ডার লাগে এই চেনের। মঙ্গলবার কোনও রকমে পাঁচটি সিলিন্ডার জোগাড় হয়েছে। বিরিয়ানি আইটেম চালু রাখার জন্য বিকল্প হিসেবে কাঠকয়লার ব্যবহার বাড়ানোর কথা ভাবছেন সংস্থার কর্ণধার। তবে সেটাও কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।
পূর্বাঞ্চলের হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠনের সভাপতি সুদেশ পোদ্দারের কথায়, 'হোটেল এবং রেস্তোরাঁ শিল্পের সঙ্গে বিপুল কর্মীর রুটিরুজি জড়িয়ে। কেন্দ্র এ দিকে নজর না দিলে আগামী দিনে তা কর্মসংস্থানের সঙ্কট তৈরি হতে পারে।' ইন্ডিয়া হোটেলস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয় শেট্টি বলেন, 'গ্যাসের ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতির আশু সমাধান না হলে কার্যত অচল হয়ে পড়বে হোটেল এবং হসপিটালিটি শিল্প।'
দেশে রান্নার গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে সমস্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে মঙ্গলবার বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সংঘর্ষ পরিস্থিতির আঁচ যাতে ঘরোয়া এলপিজি গ্রাহকদের উপরে না পড়ে, সে জন্য একাধিক পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ দিন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এলপিজি সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি তৈরি করেছে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। মন্ত্রক জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ও শিল্পমহলের প্রতিনিধিত্ব খতিয়ে দেখতে তেল বিপণন সংস্থাগুলির তিন জন এগজি়কিউটিভ ডিরেক্টরকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং অন্য শিল্পক্ষেত্রে এলপিজি সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজবে।
ঘরোয়া এলপিজি-র জোগান নিয়ে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, সে জন্য বাণিজ্যিক এলপিজি উৎপাদনের বদলে বেশি করে ঘরোয়া এলপিজি উৎপাদনের জন্য তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র। গত শুক্রবার দেশের হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠনের তরফে পেট্রোলিয়ামমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে আশঙ্কার বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন দেশের মোট এলপিজির বড় অংশ বাড়ির রান্নার কাজে লাগে। বছরে প্রায় ৩১.৩ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহার হয় ভারতে। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশই ব্যবহার হয় গেরস্তের রান্নাঘরে। বাকি ব্যবহার হয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এই বিপুল চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশই মেটাতে হয় আমদানি করে। সংঘাত পরিস্থিতিতে বড়সড় প্রভাব পড়েছে আমদানিতে। কত দিনে আমদানি স্বাভাবিক হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
এর ফলেই বিকল্প খুঁজছে শহরের হোটেল এবং রেস্তোরাঁগুলি।