সংবেদনশীল মামলায় যুগান্তকারী রায় সুপ্রিম কোর্টের। বুধবার ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’ (Passive Euthanasia) অর্থাৎ নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদনে সাড়া দিল শীর্ষ আদালত। গাজিয়াবাদের ৩২ বছর বয়সি হরিশ রানা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোমায় আচ্ছন্ন, ‘পার্মানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ রয়েছেন । তাঁর পরিবার তাঁকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে চেয়ে শীর্ষ আদালতে নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন করেছিলেন। এই সংবেদনশীল মামলায় সব দিক খতিয়ে দেখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা (Justice JB Pardiwala) এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের (Justices KV Viswanathan ) ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার হরিশ রানার পরিবারের আবেদন মঞ্জুর করল।
উল্লেখ্য, অরুণা শানবাগ মামলায় (Aruna Shanbaug Case) ২০১১ সালে Passive Euthanasia-এর আবেদনে অনুমোদন দিয়েছিল আদালত। যদিও তখন দেশে নিষ্কৃতি মৃত্যু ছিল অবৈধ।২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের প্যাসিভ ইউথানেশিয়া-কে আইনি বৈধতা দেওয়ার পর তৈরি হয় গাইডলাইন। তার পরে হরিশ রানার ক্ষেত্রে প্রথম বার অনুমোদন পেল নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন।
৩২ বছরের তরতাজা যুবক হরিশ রানার জীবনটা আচমকাই থমকে যায় ২০১৩ সালে। পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। চণ্ডীগড়ের এক হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতেন দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা হরিশ। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট চারতলার ব্যালকনি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছিলেন তিনি। সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই বিছানায় অক্ষম ও চলৎশক্তিহীন হরিশ। নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারেন না। শুধু পাঁজরের অন্দরে থাকা হৃদপিণ্ডের লাবডুবটুকুই জানান দেয় ওই শরীরটায় এখনও আছে প্রাণ। কিন্তু বাইরের জগৎ সম্পর্কে চেতনা নেই কোনও তাঁর। চিকিৎসার ভাষায়, তরুণ হরিশ রানা কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে আক্রান্ত।
যন্ত্রের সাহায্যে কৃত্রিম উপায়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চলে। নাকে নল দিয়ে তরল খাবার যায়। ছেলের এই ‘অমানবিক’ কষ্ট আর চোখের সামনে সহ্য করতে না পেরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হরিশ রানের বৃদ্ধ বাবা মা। তাঁর সেরে ওঠার কোনও আশা নেই জেনেই কোর্টের কাছে নিষ্কৃতি মৃত্যুর আর্জি জানিয়েছিসেন তাঁরা। এ বছরের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির শুনানি হয়। অবশেষে এদিন শয্যাশায়ী হরিশের বাবা-মায়ের অনুরোধে তাঁর জীবনদায়ী ব্যবস্থাকে খুলে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত।
‘আমাদেরও মরতে হবে। কে বাঁচবে আর কার মৃত্যু হবে, তা ঠিক করার আমরা কে?’ বিষয়টা কতটা সংবেদনশীল তা বোঝাতে আগেই বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ এমনই মন্তব্য করেছিল। এ দিন শীর্ষ আদালত রায় শোনাতে গিয়েও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বিচারপতিরা। হরিশের নিষ্কৃতি মৃত্যুর রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ আমেরিকার মন্ত্রী হেনরির কথা উদ্ধৃত করে বলেন,‘ঈশ্বর কোনও মানুষকে জীবন দেওয়ার সময়ে জিজ্ঞাসা করেন না সে এই জীবনকে গ্রহণ করবে কি না! অবশ্যই তা গ্রহণ করতে হয়। এই কথাগুলির তাৎপর্য আরও বেড়ে যায় যখন আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে কোনও ব্যক্তি মৃত্যুকে বেছে নিতে পারেন কি না।’ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর প্রসিদ্ধ লাইন ‘টু বি অর নট টু বি’-ও উল্লেখ করেন তাঁরা।
আদালত জানিয়েছে, দু’টি কারণের উপর ভিত্তি করে গাজ়িয়াবাদের এই তরুণের ক্ষেত্রে নিষ্কৃতি মৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এক, হরিশের চিকিৎসা ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি এবং দ্বিতীয়, রোগীর পক্ষে কোনটা ভালো, এই দিকগুলি বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আদালত জানিয়েছে, একজন ডাক্তারের দায়িত্ব রোগীর চিকিৎসা করা। ‘যখন রোগীর আরোগ্য লাভের কোন আশা থাকে না তখন সেই দায়িত্বের আর কোনও মানে থাকে না। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি- দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবার ও সকল চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন রোগীর জন্য মঙ্গলের।’
বিচারপতিদের বেঞ্চের মতে, লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের দুটি কারণ থাকতে হবে এক, রোগীর জন্য চিকিৎসা হিসেবে এটাই যোগ্য হতে হবে এবং এটি রোগীর জন্য সর্বোত্তম হতে হবে। এই পয়েন্টগুলির উপর ভিত্তি করেই হরিশ রানাকে মৃত্যুর অধিকার দিল শীর্ষ আদালত। রায়ে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ উল্লেখ করেছে রানার পরিবার, বিশেষ করে তার বৃদ্ধ বাবা-মা বছরের পর বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে তার যত্ন নিয়েছে। তাই তাঁদের আবেদন অবশ্যই যুক্তিগ্রাহ্য। শীর্ষ আদালতের রায় অনুযায়ী, এর পরে হরিশ রানাকে AIIMS-এর প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই হবে পরবর্তী প্রক্রিয়া।