সর্বাঙ্গে লাগানো অজস্র যন্ত্র। নাকে রাইলস টিউব। কোনও নড়াচড়া নেই, সাড়াশব্দ নেই। এই ভাবেই চলৎশক্তিহীন হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন এক যুবক। মাঝে মাঝে ওঠানামা করছে বুক। হৃদপিণ্ডের লাবডুবটাই শুধু জানান দিচ্ছে ওই শরীরেও রয়েছে প্রাণ। ১৩ বসন্ত এমন ভাবেই চেতনাহীন হয়ে কেটেছে বিছানায়। আগামী দিনেও তাঁর অবস্থার কোনও উন্নতি হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে মেডিক্যাল বোর্ড। ছেলের এমন অবস্থা আর দেখতে না পেরে আদালতের কাছে ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’ (Passive Euthanasia) অর্থাৎ, নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আবেদন জানান হরিশ রানার বৃদ্ধ বাবা-মা। বুধবার দীর্ঘ আলোচনা পর্ব ও বিবেচনার শেষে ঐতিহাসিক রায়ে হরিশ রানাকে ‘মৃত্যুর অধিকার’ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেঞ্চ।
‘টু বি অর নট টু বি?’ হ্যামলেটের এই বিখ্যাত উক্তি এ দিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল কারও বেঁচে থাকা আর না থাকার মধ্যেকার এক কঠিন সিদ্ধান্ত। জীবন-মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে যুক্তিবাদী শীর্ষ আদালতের বিচারপতিদেরও আবেগের বাঁধ ভাঙে। হরিশ রানার মামলায় নিষ্কৃতি-মৃত্যুর সংবেদনশীল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা (Justice JB Pardiwala) এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের (Justices KV Viswanathan ) ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করেছিলেন, ‘কে বাঁচবে আর কার মৃত্যু হবে, তা ঠিক করার আমরা কে? আমাদেরও মরতে হবে।’ দীর্ঘ বিবেচনার পরে এদিন ‘পার্মানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ থাকা হরিশ রানাকে ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’ (Passive Euthanasia) অর্থাৎ নিষ্কৃতি-মৃত্যুর অনুমতি দিল শীর্ষ আদালত।
৩২ বছরের তরতাজা যুবক হরিশ রানার জীবন আচমকাই থমকে যায় ২০১৩ সালে। পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। চণ্ডীগড়ের এক পেয়িং গেস্ট অ্যাকোমোডেশনে থেকে পড়াশোনা করতেন দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা হরিশ। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট চারতলার ব্যালকনি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছিলেন তিনি। সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই বিছানায় অক্ষম ও চলৎশক্তিহীন হরিশ। চিকিৎসার ভাষায়, তরুণ হরিশ রানা কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে আক্রান্ত। তাঁর সেরে ওঠার কোনও আশা নেই জেনেই কোর্টের কাছে নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আর্জি জানিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা। বিচারপতিদের মতে, লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের দুইটি কারণ থাকতে হবে। এক, হরিশের চিকিৎসা ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি এবং দ্বিতীয়, রোগীর পক্ষে কোনটা সবচেয়ে ভালো। এই পয়েন্টগুলির উপর ভিত্তি করেই হরিশ রানাকে মৃত্যুর অধিকার দিল শীর্ষ আদালত।
‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’ (Passive Euthanasia) অর্থাৎ নিষ্কৃতি-মৃত্যুর অর্থ হলো কোনও ব্যক্তিকে অসহনীয় যন্ত্রণা বা নিরাময়হীন অসুস্থতা থেকে মুক্তি দেওয়া। এক্ষেত্রে জীবনদায়ী চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হলে রোগী স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে চিকিৎসা ব্যবস্থা চলছে—যেমন লাইফ সাপোর্ট, ফিডিং টিউব, সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ‘ইউথানাসিয়া’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘ইউ’ এবং ‘থানাতোস’ থেকে এসেছে। ‘ইউ’ শব্দটির অর্থ সহজ এবং ‘থানাতোস’ কথাটির মানে মৃত্যু। অর্থাৎ, ‘ইউথানাশিয়া’ হলো ‘সহজে মৃত্যু’।
নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আলোচনায় উঠে আসে বেশ কিছু মামলার কথা।
অরুণা শানবাগ মামলা (২০১১): এর আগে অরুণা শানবাগ মামলায় (Aruna Shanbaug Case) ২০১১ সালে Passive Euthanasia-র আবেদনে অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। যদিও তখন দেশে নিষ্কৃতি মৃত্যু ছিল অবৈধ। পেশায় নার্স অরুণা ১৯৭৩ সালে মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে ডিউটির সময়েই ধর্ষণের শিকার হন। পাশবিক অত্যাচার চলে তাঁর উপরে। আঘাতে অরুণার মস্তিষ্ক ও সুষুম্না কাণ্ডে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন থেকেই অরুণার মস্তিষ্ক আংশিক বিকল। দৃষ্টি ও বাকশক্তি চলে যায়। পরে কোমায় চলে যান অরুণা। এক সমাজকর্মী তাঁর নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন জানান। ২০১১ সালে ৭ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট অরুণা শানবাগের নিষ্কৃতি মৃত্যুতে অনুমোদন দেয়। প্রায় ৪২ বছর ধরে ভেজিটেটিভ স্টেট-এ থাকার পরে শেষে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয় অরুণার।
কমন কজ় বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (২০১৮): এ দিন হরিশ রানা মামলার রায় ঘোষণা সময়ে ২০১৮ সালের ‘কমন কজ়’ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (Common Cause v. Union of India) মামলারও প্রসঙ্গ ওঠে। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পাঁচ বিচারপতির আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’ (Passive Euthanasia) বা নিষ্কৃতি মৃত্যুকে আইনি বৈধতা দেয়। এই রায়ে লিভিং উইল (Advance Medical Directives)ও চালু করা হয়েছিল, যা কোনও নাগরিককে তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছা আগে থেকেই নথিভুক্ত করার অনুমতি দেয়। সেই ল্যান্ড মার্ক মামলার পরে এ দিন হরিশ রানার ক্ষেত্রে প্রথম বার শীর্ষ আদালত নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদনে সাড়া দিল।
উল্লেখ্য, একাধিক কেসে নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন করা হলেও তা সবক্ষেত্রে গৃহীত হয়নি। এই প্রসঙ্গে পাটনা হাইকোর্টে কোমায় আচ্ছন্ন কাঞ্চন দেবীর পরিবারের জনস্বার্থ মামলা (PIL)-র কথাও উঠে আসে। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে কোমায় চলে গিয়েছিলেন কাঞ্চন দেবী। তাঁকে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে আদালতের কাছে নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন করেছিলেন তাঁর স্বামী তারকেশ্বর চন্দ্রবংশী। তাঁর দাবি ছিল, স্ত্রীয়ের দীর্ঘ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারের সমস্ত আর্থিক সঞ্চয় শেষ হয়ে গিয়েছে। চিকিৎসায় কোনও উন্নতি হয়নি। তাই তিনি ‘মার্সি কিলিং’-এর অনুমতি চান। কিন্তু পাটনা হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানায়, একজন মানুষকে মৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের নেই। কোর্টের ভূমিকা জীবন রক্ষা করা, মৃত্যুতে অনুমোদন দেওয়া নয়।
এ ছাড়াও আদালত উল্লেখ করে, রোগী যেখানে নিজে তাঁর মতামত প্রকাশ করতে পারছেন না—এই অবস্থায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জটিল। এই মামলাটি পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেলেও, অনেকের মতে এটি ভারতে ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’ (Passive Euthanasia) বা নিষ্কৃতি মৃত্যু আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
প্রসঙ্গত, ভারতে এখনও ইউথানাসিয়া নিয়ে কোনও আলাদা পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। ফলে আদালতের নির্দেশিকা ও বিভিন্ন রায়ের ভিত্তিতেই এই বিষয়টি বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই মামলাগুলি আবারও প্রশ্ন তুলছে— একজন চেতনাহীন রোগীর পরিবারের নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন করার অধিকারের সীমারেখা কী? পরিবার ও চিকিৎসকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে কী হবে? মানবিকতা ও আইনের সীমারেখা কোথায় টানা হবে? এই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খুঁজছে বিচার বিভাগ।
২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’-এর নির্দেশগুলিকে আবারও ব্যাখ্যা করে। সেই অনুযায়ী ‘প্যাসিভ ইউথানাসিয়া’-র জন্য যদি কোনও রোগী সম্মতি দিতে না পারেন, তা হলে একজন নিকটাত্মীয় বা আইনি অভিভাবক চিকিৎসকদের অভিমত নিয়ে আইনি বিজ্ঞপ্তি সাপেক্ষে প্রক্রিয়াটি শুরু করতে পারেন।
এ ছাড়া দরকার দু’টি মেডিক্যাল বোর্ড। নিষ্কৃতি-মৃত্যুর সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজন মেডিক্যাল বোর্ডের সার্টিফিকেট। হাসপাতাল ছাড়াও একটি সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ডও দরকার। তা জেলা স্তরেও তৈরি করা হতে পারে। এই দুই মেডিক্যাল বোর্ডই যদি জানায়, রোগীর সুস্থ হওয়ার বা তার অবস্থার পরিবর্তনের কোনও আশাই নেই, তা হলে নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আবেদনে বাধা থাকে না। ২০১৮ সালের কমন কজ় বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া কেসে বলা লিভিং উইল-এর ক্ষেত্রে গেজ়েটেড অফিসার বা নোটারিকে দিয়ে তা অ্যাটেস্টেড করতে হবে।