রাজ্যের নবনিযুক্ত রাজ্যপাল আর এন রবি আজ কলকাতায় আসছেন। বৃহস্পতিবার লোকভবনে তিনি শপথ গ্রহণ করবেন। তারআগে রাজ্যবাসীকে খোলা চিঠি লিখলেন বিদায়ী রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। কলকাতা ছেড়ে কেরলের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন বিদায়ী রাজ্যপাল ডঃ সিভি আনন্দ বোস ৷ তার আগে রাজ্যবাসীর জন্য বিশেষ বার্তা দিলেন তিনি।
রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর খোলা চিঠিতে সিভি আনন্দ বোস লিখেছেন,'রাজ্যপাল পদে আমার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে ৷ তবুও পশ্চিমবঙ্গে আমার যাত্রা এখনও শেষ হয়নি । আমি আমার দ্বিতীয় বাড়ি-পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যুক্ত থাকব ।'
কী লিখলেন রাজ্যপাল?
চিঠির শুরুতেই পশ্চিমবঙ্গবাসীকে নিজের প্রিয় ভাই ও বোন বলে উল্লেখ করেছেন আনন্দ বোস। আরও লিখেছেন, 'আমার প্রিয় বাংলার ভাই ও বোনেরা, কলকাতার লোকভবনে আমার ইনিংস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আবারও আপনাদের প্রতি আমার সমর্থন এবং বিবেচনার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি । আমাদের প্রিয় রাজ্যের স্নেহশীল এবং যত্নশীল মানুষের আলিঙ্গনে কাটানো মুহূর্তগুলি আমি লালন করি । আমার বোনের আলিঙ্গন, আমার পিঠে সেই ছোট্ট ছেলের চাপড়, সেই যুবকের দৃঢ় করমর্দন, দূর থেকে তোলা হাতের শক্তিশালী বার্তা আমার মনে আছে ।'
বোসের আরও সংযোজন, 'যদিও আমার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে, তবুও পশ্চিমবঙ্গে আমার যাত্রা এখনও শেষ হয়নি । আমি আমার দ্বিতীয় বাড়ি-পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যুক্ত থাকব। আমি ঈশ্বরকে খুঁজতে চেয়েছিলাম ৷ কলকাতার অলি-গলিতে, গ্রাম ও শহরের রাস্তায়, শিশুদের উজ্জ্বল উৎসাহী চোখে, বয়স্কদের স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছি । বন্ধুরা, গত তিন বছরে, আমি রাজ্যের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ভ্রমণ করার এবং মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগ পেয়েছি, আমি তাদের খড়ের কুঁড়েঘরে মানুষের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করেছি, আমি তরুণ পণ্ডিতদের সঙ্গে পড়াশোনা করেছি, আমি মহান শিক্ষিত পুরুষ ও মহিলাদের সঙ্গে আলাপচারিতা করেছি। আমাদের ভাইদের সামাজিক ব্যবস্থায় যে গর্ব রয়েছে তা বাংলার মানসিকতার কথা বলে। কয়েক দশক আগে, মহাত্মা গান্ধি বলেছিলেন, "আমি বাংলা ছেড়ে যেতে পারছি না এবং বাংলা আমাকে যেতে দেবে না ।" আজ আমি সেই অনুভূতি ভাগ করে নিচ্ছি । এই পবিত্র মাটির বিদ্যুৎস্পৃষ্ট চুম্বকত্ব এমনই, যা দেশের পথ দেখানো মহান পুরুষ ও নারীদের জন্ম দিয়েছে। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা স্মরণ করে উদ্ধৃত করছি , "এই জপ, গান এবং পুঁতির বাণী ছেড়ে দিন... তিনি সেখানে আছেন যেখানে চাষী কঠিন মাটি চাষ করছে এবং যেখানে পথিক পাথর ভাঙছে..."। বন্ধুরা, আমি নিশ্চিত যে আমার বাংলার ভাই ও বোনেরা অনেক উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং আমি, আমার বিনীতভাবে এতে অবদান রাখব । আগামী দিনগুলিতে বাংলা গৌরবের উচ্চতায় পৌঁছাক । সকলের জন্য সমৃদ্ধি এবং সুস্বাস্থ্য বয়ে আনুক । মা দুর্গা আমার জনগণকে রক্ষা করুন । বন্দে মাতরম ৷'
প্রসঙ্গত, হঠাৎ করেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদ থেকে সরে দাঁড়ান সিভি আনন্দ বোস। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ২০ মাস আগেই সিভি আনন্দ বোসের আচমকা পদত্যাগ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজভবনের লেটারহেডে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি রাষ্ট্রপতিকে ‘প্রণাম’ জানিয়ে লিখেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদ থেকে তিনি ইস্তফা দিচ্ছেন। তাছাড়া সেই চিঠিতে রাষ্ট্রপতি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জাতীয় নেতৃত্বকে তিনি ধন্যবাদ জানান। রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা পেয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সিভি আনন্দ বোস।
২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলার রাজ্যপাল হন প্রাক্তন এই আমলা। প্রশাসনিক নিয়মে তাঁর মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু সেই সময়সীমার ঢের আগেই কেন তিনি সরলেন, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনা তুঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সিভি আনন্দ বোসের এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি রাজ্যপাল নিয়োগের বিষয়ে কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ধর্মতলায় ধর্না প্রত্যাহারের পরেই মঙ্গলবার আলিপুরে সরকারি অতিথি নিবাস ‘সৌজন্য’-এ গিয়ে রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দেখা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাক্ষাৎ-পর্ব শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সিভি আনন্দ বোসের প্রতি যা হয়েছে ‘অন্যায়, ইনজাস্টিস’। আচমকা রাজ্যপালের পদ থেকে বোসকে সরিয়ে দেওয়া ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মনে করেন মমতা।
এদিকে পদত্যাগের পর আনন্দ বোস এক বিবৃতিতে জানান, 'পশ্চিমবঙ্গে আমার ইনিংস শেষের দিকে । বাংলার মহান মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ । এখন বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে কাজ করতে আমি কেরালায় যাচ্ছি । জাতীয় নেতৃত্বের নির্দেশনায় এই নতুন দায়িত্ব পালন করব।'