এই সময়, গঙ্গাসাগর ও কলকাতা: মঙ্গলবার দিল্লি উড়ে যাওয়ার আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Chief Election Commissioner Gyanesh Kumar) স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে গিয়েছিলেন, এ বার বাংলায় রক্তপাতহীন ভোট করাতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। কিন্তু তিনি বাংলা ছাড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রক্ত ঝরল! গুলিবিদ্ধ হলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার গঙ্গাসাগর এলাকার ত্রিলোকেশ ঢালি নামে এক বিজেপি (BJP) নেতা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপির দাবি, দিন–দুপুরে বিরোধী দলের নেতা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকেই স্পষ্ট বাংলায় আইনের শাসন নেই। তৃণমূলের পাল্টা প্রশ্ন, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোড়াফুলের লড়াই আইএসএস এবং সিপিএমের সঙ্গে। সেখানে বিজেপি কোথা থেকে এল?
বাংলায় আসন্ন বিধানসভা ভোটে কোনও জায়গায় হিংসা হলে তার জন্য যে রাজ্যের অফিসাররাই দায়বদ্ধ থাকবেন, সেটা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে গিয়েছে দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে জেলাশাসক ও পুলিশ–প্রশাসনকে লক্ষ্য করে জ্ঞানেশ কুমার বলেছিলেন, ‘হয় বোমা থাকবে, না হলে আপনারা থাকবেন।’
বোমা না পড়লেও গুলি চলল। এবং সেটা জ্ঞানেশ কুমার কলকাতা ছাড়ার পরের দিনই। বুধবার সকাল আটটা নাগাদ দক্ষিণ ২৪ পরগনার গঙ্গাসাগর উপকূল থানার অন্তর্গত শ্রীধাম বাসস্ট্যান্ডের অদূরে ঘটনাটি ঘটেছে। অভিযোগ, এ দিন সকালে দুষ্কৃতীরা বাইকে করে এসে ত্রিলোকেশকে গুলি করে পালায়। গুলি লাগে ওই বিজেপি নেতার বুকে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে যান তিনি। তাঁকে প্রথমে সাগর গ্রামীণ হাসপাতাল, সেখান থেকে ডায়মন্ড হারবার মেডিক্যাল কলেজ এবং পরবর্তীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন ত্রিলোকেশ। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। দুষ্কৃতীদের খোঁজে শুরু হয়েছে তল্লাশিও। বিজেপির মথুরাপুর সংগঠনিক জেলা কমিটির প্রাক্তন সেক্রেটারি ছিলেন ত্রিলোকেশ। তাঁর পুত্র ত্রিদীপ বর্তমানে গঙ্গাসাগরে বিজেপির তফসিলি মোর্চার নেতা।
বাংলার বিধানসভা ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কড়া মনোভাবের আবহে এই গুলি চলার ইস্যুকে হাতছাড়া করতে চাইছে না বিজেপি। প্রতিবাদে এ দিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেশ কিছু এলাকায় পথ অবরোধ করে তারা। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর প্রতিক্রিয়া, ‘বাংলায় আইনের শাসন বলে কিছু নেই। এই রাজ্যের প্রান্তিক মানুষরা প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন।’ তাঁর সংযোজন, ‘পশ্চিমবঙ্গে তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ কী অবস্থায় আছে, আজকের ঘটনা তারই প্রমাণ। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ সব থেকে বেশি খুন হয়েছেন। আজ সাগর বিধানসভায় আমাদের পার্টির স্থানীয় তফসিলি মোর্চার নেতা ত্রিদীপ ঢালির বাবা ত্রিলোকেশ ঢালির উপরে গুলি চালানো হলো। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই সব দেখছে।’ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপির শক্তি দ্রুত বাড়ছে। সেই হতাশা থেকে বিজেপি নেতার উপরে গুলি চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক আসনে এ বার তৃণমূল কংগ্রেস হারবে। কারণ, গত দু’মাসে সাগর, পাথরপ্রতিমা, মথুরাপুর–সহ বিজেপির কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় হয়েছে। আমিও এই সব এলাকায় একাধিক সভা করেছি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আমাদের পরিবর্তন সংকল্প যাত্রার উদ্বোধন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা থেকেই করেছেন। তৃণমূল ভয় পেয়েছে। তাই পরাজয়ের আতঙ্কে গুলি–বন্দুক বার করেছে।’
জোড়াফুল শিবির অবশ্য পদ্ম–ব্রিগেডের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রথম কথা তৃণমূল কংগ্রেস হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় আমাদের যেটুকু লড়াই সেটা আইএসএএফ আর সিপিএমের সঙ্গে। বিজেপি পিকচারেই নেই। তা হলে তৃণমূল অকারণে কেন বিজেপিকে নিশানা করবে?’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘এই ঘটনা পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ঘটলে তা–ও বিরোধীদের অভিযোগের একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া ়যেত। যে দলটার কোনও অস্তিত্বই নেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায়, সেই দলের কর্মীর উপর হঠাৎ তৃণমূল হামলা করতে যাবে কোন দুঃখে?’