এই সময়: নিশ্চিন্ত আর থাকা গেল না। কেন্দ্রের আশ্বাস সত্ত্বেও গ্যাসের (LPG CRISIS) সঙ্কট থাবা বসাতে শুরু করেছে দেশজুড়ে। বুধবারও নয়াদিল্লির তরফে অভয়বাণী এসেছে, আশঙ্কার কিছু নেই। তবে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একটি সতর্কবার্তা — একটু হিসেব কষে গ্যাস ব্যবহার করুন। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বুকিংয়ের মধ্যে ন্যূনতম ব্যবধান ২১ থেকে ২৫ দিন করা হয়েছে। এ দিন সন্ধেয় ‘ভারত পেট্রোলিয়াম’ জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহে রাশ টানা হবে। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে গেরস্থালিকে। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের তরফে গ্যাস বাঁচাতে প্রেশার কুকারের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রেশার কুকারে সেপারেটর ব্যবহার করে একইসঙ্গে চাল-ডাল-সব্জি রান্নার পরামর্শও দিয়েছে এই সংস্থা। অতএব দিল্লি থেকে যতই যা আশ্বাস দিক, গণপরিবহণ থেকে হেঁসেল, রেস্তোরাঁ হয়ে দেবতার ভোগ — গ্যাস নিয়ে দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তার মেঘ জমতে শুরু করেছে সর্বত্র।
কেন গ্যাসেই চিন্তা
ভারত যে শুধুমাত্র বার্ষিক চাহিদার ৮৮-৮৯% তেল আমদানি করে তা-ই নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের (Natural Gas) ৫০ শতাংশও আসে বিদেশ থেকে। এই প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে লিক্যুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) (LPG) উৎপাদন ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ বলে ভারত তার বার্ষিক চাহিদার ৬০-৬৫% এলপিজি সরাসরি আমদানি করে, যার আবার প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ আসে হরমুজ় প্রণালী ধরে। যে সাপ্লাই চেন বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে এলপিজি-র দাম অনেকটাই বেড়েছে ইরান-ইজ়রায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের আবহে। একই যুক্তি প্রযোজ্য পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত ট্র্যান্সপোর্ট ফুয়েল কমপ্রেসড ন্যাচরাল গ্যাসের (সিএনজি) (CNG) ক্ষেত্রে। ভারত সরাসরি সিএনজি না কিনে লিক্যুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস (এলএনজি) (LNG) আমদানি করে সেখান থেকে সিএনজি বানিয়ে নেয়। বিশ্বে বর্তমানে চতুর্থ বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারী দেশ হলো ভারত। কিন্তু এই এলএনজি-র প্রায় পুরোটাই আসে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ওমান থেকে। কাতার ইতিমধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করেছে। বাকি দুই দেশ থেকে হরমুজ় প্রণালী হয়ে আসা এলএনজি-র সাপ্লাইও এখন বন্ধ। ফলে সিএনজি-র দাম বৃদ্ধি একপ্রকার অনিবার্য বলে মনে করছেন অনেকে।
কেন্দ্রের অবস্থান
বুধবার পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের (Petrolium Ministry) যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা আশ্বস্ত করেন, ‘এখনই উদ্বেগের কারণ নেই৷ বুক করার দু’-তিন দিনের মধ্যে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া যাবে৷ অযথা আতঙ্কিত হয়ে বেশি সিলিন্ডার সংগ্রহ করার চেষ্টা করবেন না৷’ তাঁর যুক্তি, অতিরিক্ত সংগ্রহ বন্ধ করতেই বুকিংয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের একাংশের সংশয়, ভাঁড়ারে টান পড়েছে বলেই কি এই সিদ্ধান্ত? যে সঙ্কট উত্তরোত্তর বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। যদিও সুজাতা এ দিন দাবি করেছেন, দেশে পর্যাপ্ত খনিজ তেল রয়েছে৷ ঘরোয়া এলপিজি-র উত্পাদন বেড়েছে ২৫ শতাংশ৷
এই পরিস্থি্তিতে এ দিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন দেশের সব রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক প্রধানদের সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রস্ত আলোচনা করেন৷ সূত্রের খবর, আলোচনায় গোবিন্দ দাবি করেছেন, আপাতত দু’সপ্তাহের জ্বালানির স্টক মজুত আছে দেশে৷ এর মধ্যেই বিকল্প রাস্তায় পরিস্থিতির মোকাবিলা করা হবে৷ তবে সেই বিকল্প পন্থা কী, বুধবার রাত পর্যন্ত সে বিষয়ে সবিস্তারে জানা যায়নি।
আশ্বাস মমতার
বাংলায় অন্তত স্বাস্থ্য, মিড-ডে মিল ও আইসিডিএস ক্ষেত্রে গ্যাস নিয়ে সমস্যা হবে না বলে বুধবার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। এ দিন তাঁর সঙ্গে বৈঠকে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির প্রতিনিধিরা সেই আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে সংস্থাগুলি এবং ডিলারদের কাছে তাঁর আবেদন, রাজ্যের বটলিং প্লান্টগুলিতে তৈরি গ্যাস যেন এই পরিস্থিতিতে ভিন রাজ্যে পাঠানো না হয়। তিনি জানান, এ নিয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) তৈরি করবে সরকার। সূত্রের খবর, মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি কন্ট্রোল রুমও খোলা হয়েছে। আজ, বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী সব জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করবেন। বিকেলে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা এবং ডিলারদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন মুখ্যসচিব।
এ দিন বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সঙ্কট কাটাতে আমরা বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ করেছি। ডিলারদের সঙ্গে আলোচনায় বুঝলাম, জ্বালানি তেল নিয়ে এখনও ততটা সমস্যা হয়নি। মূল সমস্যা হচ্ছে এলপিজি গ্যাসে। আমরা বললাম, রাজ্যে যা গ্যাস মজুত আছে, তা আর বাইরে পাঠাবেন না। সমস্যা মিটে গেলে আবার সেটা করতে পারেন। সংস্থাগুলির সঙ্গে কথা বলে একটা এসওপি তৈরি হবে। অযথা আতঙ্কিত হবেন না।’ অভিযোগ উঠেছিল, গ্যাস বুকিংয়ের জন্য সংস্থাগুলিতে ফোন করলে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর বলেন, ‘ডিলারদের সঙ্গে এ নিয়েও কথা হয়েছে। ওঁরা জানান সার্ভারে সমস্যা হয়েছিল। সেটা মিটে গেলেই আগের মতোই বুকিং নেওয়া হবে।’
সরব বিরোধীরা
কেন্দ্রের তরফে আশ্বাস দেওয়া হলেও, বিরোধীদের আক্রমণের ঝাঁজ বিন্দুমাত্র কমেনি। কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘কোনও প্রস্তুতি বা বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই গ্যাস বুকিংয়ের ক্ষেত্রে ২৫ দিনের নতুন নিয়ম চালু করে দিল কেন্দ্র। এতে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এসআইআর-এ নাম কাটার দিকে না তাকিয়ে, মানুষের অধিকার না কেড়ে গ্যাসের সমস্যা আগে মেটান।’ সরব হয়েছেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নও — ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করছি, অবিলম্বে পদক্ষেপ করুন। সাধারণ মানুষের উপরে বোঝা বাড়ছে।’ আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, ‘একের পর এক রেস্তোরাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর দায় কে নেবে?’
সঙ্কট-চিত্র
ভারতীয় রেলে খাবার সরবরাহকারী সংস্থা আইআরসিটিসি-র (IRCTC) তরফে দেশের সব বেস কিচেনে ইন্ডাকশন আভেন এবং মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোটেল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি কেবি কাচরু বলেছেন, ‘এই চাপে ছোট ও মাঝারি হোটেল-রেস্তোরাঁগুলি সাময়িক ভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে।’ চেন্নাই হোটেলস অ্যাসোসিয়েশনের তরফে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে, ‘তামিলনাড়ুর বহু ছোট হোটেল-রেস্তোরাঁ মঙ্গলবার রাতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আপনি অবিলম্বে এই সঙ্কট থেকে মুক্তির দিশা দেখান।’ ন্যাশনাল রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চললে দেশের ৬০ শতাংশ ফুড আউটলেট খুব শিগগিরই ঝাঁপ ফেলতে পারে।