• গ্যাস থাকলেও চাল-ডাল-আলু না পেলে রাঁধবেন কী? জ্বালানি-উদ্বেগের আড়ালে বাড়ছে ‘নীরব বিপদ’!
    এই সময় | ১২ মার্চ ২০২৬
  • পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যুদ্ধের জেরে ক্রমে জ্বালানির দাম বাড়ছে। ইতিমধ্যেই দাম বেড়েছে রান্নার গ্যাসের। সিলিন্ডার মিলবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সরকার যদিও এখনও পর্যন্ত চিন্তা করার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করছে। তবে উদ্বেগ সহজে যাচ্ছে না। কিন্তু জ্বালা কি শুধু গ্যাসে বা তেলে? ধরে নিলাম দু’টোর কোনওটারই অভাব হলো না। কিন্তু যদি চাল, ডাল, আলু, পটোল না থাকে, তা হলে রান্নার গ্যাস থাকলেও রাঁধবেন কী? ভারতের কৃষিক্ষেত্রেও যে ক্রমে পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধের কালো ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

    ইজ়রায়েল আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরানের সংঘাত ক্রমে বাড়তে থাকায় গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালীতে আপাতত জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ। শুধুমাত্র চিন ও রাশিয়ায় জাহাজকে ছাড় দিচ্ছে ইরান। এর বাইরে ১ লিটার তেল তারা হরমুজ় দিয়ে নিয়ে যেতে দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

    এই তেল ও গ্যাসের সঙ্কটের বিষয় নিয়ে চর্চাও কম হচ্ছে না। কিন্তু এই চর্চার আড়ালে প্রায় নিঃশব্দে বেড়ে চলেছে আরও এক বিপদ। হরমুজ় বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে ভারতের সার আমদানির উপরে।

    পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের আমদানি করা অধিকাংশ সারই আসে কাতার, সৌদি আরব, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, ইরান থেকে ভারত খুব সামান্য সারই কেনে (২০২৪ সালে মাত্র ২.৫৯ মিলিয়ন ডলারের)।

    মূল সমস্যা হলো, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ থেকে কেনা বিপুল পরিমাণ সার এই হরমুজ় প্রণালী দিয়েই জাহাজে করে ভারতে আসে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পথ অবরুদ্ধ হওয়ার অর্থ ভারতের সার আমদানিতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ঘাটতির ঝুঁকি রয়েছে।

    এই আমদানি নির্ভরতা কমাতে ‘মেক-ইন-ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অধীনে দেশে ইউরিয়া উৎপাদন বাড়িয়ে সার ক্ষেত্রে স্বয়ম্ভর হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই যুদ্ধ বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ থাকা।

    ইউরিয়া তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদানই হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। সংবাদসংস্থা রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে, ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গ্যাস আমদানিকারক সংস্থা ‘পেট্রোনেট’ রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থাগুলিকে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিম এশিয়া থেকে গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

    রাশিয়া বা চিন থেকে সার আমদানির বিকল্প পথ খোলা থাকলেও, যুদ্ধের কারণে বিমার খরচ ও জাহাজের ভাড়া হু হু করে বাড়ছে। তবে কৃষকদের জন্য আশার কথা হলো, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে, দেশে সারের মজুত যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেছিল কেন্দ্রীয় সার মন্ত্রক।

    ‘এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল’ (S&P Global)-এর বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন খারিফ মরসুমে খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং কৃষি-প্রধান ভারতের কৃষকদের অসন্তোষ এড়াতে, প্রয়োজনে চড়া দামেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার কিনতে পিছপা হবে না সরকার।

    সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ায় ট্রাম্প-নেতানুিয়াহুর এই সামরিক অভিযান ভারতের সামনে এক জটিল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে রাজকোষের উপরে চাপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে দেশের বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সরকারের কাছে এখন বড় পরীক্ষা।

    সাময়িক ভাবে মজুত ভাণ্ডার দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার স্বার্থে ভারতকে যে আমদানির বিকল্প পথ খোঁজা এবং দেশীয় সার উৎপাদনে আরও জোর দিতে হবে, তা এই সঙ্কট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন দেখার, বিশ্ব রাজনীতির এই ডামাডোলের মাঝে দেশের কৃষিক্ষেত্র এবং কৃষকদের স্বার্থকে সরকার শেষ পর্যন্ত কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারে।

  • Link to this news (এই সময়)