• মমতার রাজনৈতিক কৌশলের নাগাল পেতে এখনও ঢের দেরি BJP'র
    আজকাল | ১৩ মার্চ ২০২৬
  • উদ্দালক

    একদিকে বিজেপির রথযাত্রা চলছে। কিন্তু প্রচারের আলো আটকে ধর্মতলায়। যেটুকু আলো বিজেপি চেয়েছিল নিজের দিকে টেনে নিতে, কার্যত সেই মুখের গ্রাস কেড়ে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। ভোটের মুখে এসআইআর করে বিজেপি নিজেই নিজের হার ডেকে এনেছে, তার মধ্যেও ভোট-পূর্ব স্লগ ওভারে একইঞ্চিও ছাড়তে চাননি মমতা। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ জানে তিনি প্রান্তজনের সখা, কিন্তু ধর্মতলার ধরনা মঞ্চ যেন তাঁকে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিল। শুধু পৌঁছে দিল তাই নয়, বরং পাশাপাশি বিজেপি’র রথযাত্রার জাঁকজমককেও আলগা করে দিল। সংমর্থকদের ভিড়ে না থাকলেও বিজেপি ভেবেছিল মিডিয়ার প্রাইম টাইম রথযাত্রার সঙ্গে থাকে, কিন্তু আন্দোলনের এমন ঢেউ তুললেন মমতা যে তার কাছে বিজেপির স্তিমিত আন্দোলন খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। আর সব প্রচারের ঝাঁঝে জিতে গেলেন তৃণমূল নেত্রী। 

    পথ-চলতি মানুষ, জেলার বিভিন্ন বৃত্তের, বিভিন্ন স্তরের বিধায়ক, মন্ত্রী, নেতা-কর্মীরা দফায় দফায় ধর্মতলায় এসেছিলেন এই কয়েকদিন। ভোটের মুখে তৃণমূলের সম্মেলনের মতো আকার নিয়েছিল শহরের প্রাণ কেন্দ্র। মোটের উপর ওই মঞ্চ থেকেই একটা আন্দাজ পাওয়া গিয়েছে কারা এবারের ঠিক নির্বাচনের মুখে তৃণমূল নেত্রীর গুডবুকে আছেন, কাদের প্রতি নেত্রী বিরূপ। শুধু তাই নয়, বুদ্ধিজীবী মহলের দুই অভিভাবক-সম মানুষকে একই দিনে, একই সঙ্গে মঞ্চে এনেছেন মমতা। জয় গোস্বামী ও কবীর সুমনের বক্তৃতা আলাদা তরঙ্গ তৈরি করেছে। তিনি মঞ্চ থেকে ছবি এঁকেছেন, বিভিন্ন প্রজন্মের নেতৃত্বকে এগিয়ে দিয়েছেন সামনের দিকে, নিজে গান করেছেন, অন্যদের দিয়ে বাংলা, ইংরাজি হরেক ভাষার গান গাইয়েছেন। সব মিলিয়ে একটা কার্নিভালের পরিণত করতে পেরেছেন আন্দোলনকে। বিজেপি ভেবেছিল, পরিবর্তন যাত্রায় এমনই এক কার্নিভাল তৈরি করবে দল, কিন্তু তার মধ্যে হঠাৎ আন্দোলনের মুখ মমতার এহেন প্রবেশ গোটা পরিকল্পনাকেই মাটি করে দিয়েছে। 

    কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের নেতা-নেত্রী, সুসজ্জিত গাড়ি, কনভয়, এলাকা জুড়ে ছেয়ে ফেলা পতাকা, পোস্টার, ব্যানার, হোর্ডিং কিছুরই বাকি রাখেনি গেরুয়া শিবির। কিন্তু বারবার এই আন্দোলনের সময় কঙ্কালসার সংগঠনের চেহারা আরও স্পষ্ট হয়েছে। কোনও ভিডিওয় দেখা গিয়েছে হাওয়ায় হাত নাড়ছেন শুভেন্দু অধিকারী, কারও মনোযোগ তাঁর দিকে নেই, কোথাও আবার স্থানীয় মিটিংয়ে দেখা গিয়েছে, পড়ে আছে রাশি-রাশি খালি চেয়ার। এত আয়োজন করেও মিটিংয়ে লোক আনা যায়নি। অর্থাৎ, তাৎক্ষণিক ভোট-পূর্ব কালে প্রচারের খেলায় কার্যত ল্যাজেগোবরে হয়ে হয়েছে গেরুয়া শিবিরকে। এমনকী এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দফতরের সামনে বামেদের অবস্থান নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, বিজেপির পরিবর্তন যাত্রা নিয়ে তার সিকিভাগও হয়নি। অর্থাৎ ভোটের মুখে এটা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, এসআইআর-এর বিরোধিতার ঢেউ যতটা সু-উচ্চ, পক্ষের ঢেউ তার কাছাকাছিও নয়। ফলে আগেই অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে তৃণমূল শিবির। 

    শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য-সভাপতি হওয়ার পর থেকে বিজেপির প্রথম একাদশ থেকে শুভেন্দু অধিকারী ধীরে-ধীরে অনেকটা ফেডআউট হয়ে গিয়েছেন। এখন উঠে আসছেন রাহুল সিনহা, দিলীপ ঘোষেদের মতো আদি-বিজেপিরা। গেরুয়া শিবিরের কথা মতো যদি মেনেও নেওয়া যায়, আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব দলে নেই, তবেও শুভেন্দুর ঝাঁঝ কমার বিষয়টা কারও চোখ এড়ায়নি। আর আগের মতো দলবদলের ঢেউও এবার নেই। সিপিএম ফেরত প্রতীক উর ছাড়া এই বাজারে তেমন হেভিওয়েট শিবির পাল্টাননি। এবারের ভোট যেন আগে থেকে অনেক বেশি শান্ত, নিস্তরঙ্গ। তারমধ্যেও যেটুকু তরঙ্গ আছে তা তৈরি করছেন একমাত্র মমতা ব্যানার্জি। কোর্টে সওয়াল থেকে শুরু করে ধরনা মঞ্চ পর্যন্ত, মমতা যদি নিজে এতকিছু না করতেন, ভোট আরও উত্তেজনাহীন, ম্যাড়াম্যাড়া হতো, সাংবাদিকদের কাছে যা একান্তই অনভিপ্রেত। সেই কারণেও মমতা ব্যানার্জির এই আন্দোলনের ধার-ভার কিছুটা হলেও নতুন করে প্রাণসঞ্চার করছে প্রতিরোধহীন বাংলার নির্বাচনে। 

    উল্লেখ্য আজই নতুন রাজ্যপাল শপথ নিয়েছেন। দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন রাজ্যের। ৬০ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের বিচার সম্পূর্ণ না করে প্রায় কোনও দলই নির্বাচনে যেতে চাইছে না, কিন্তু হাতে ততটা সময় নেই। নির্বাচন যদি সময়ে করতে হয়, তবে আর কয়েকদিনের মধ্যেই ঘোষণা করতে হবে ভোটের নির্ঘণ্ট। আর দেখা যাবে, অল্পদফার ভোটের ঘোষণার পর প্রার্থীরা যুত করে বসতে-বসতেই নির্বাচন চলে আসবে। দীর্ঘকালীন প্রচারের যে মজা, যে আমেজ, তা থেকে ভোট-আগ্রহীরা বঞ্চিত হবেন। এখন একমাত্র নতুন করে রাজনৈতিক তরঙ্গ তৈরি হতে পারে সরকার ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসনে নির্বাচন হলে। যদিও সেই জটিল রাজনৈতিক পথে কেন্দ্রীয় শাসকদল হাঁটবে কী না, সন্দেহ। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই হয়ত আর কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন ঘোষণা করা হবে। আর তারপরেই দ্রুত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দেবে তৃণমূল কংগ্রেস। বামেদের কথা ছেড়েই দিলাম, কংগ্রেসের সঙ্গ নেই, বাকিদের মধ্যে আইএসএফ আদৌ থাকবে কী না, সন্দেহ, কোনও আসন না পাওয়া দলের এবারেও বোধহয় একটি আসনও পাওয়ার ইচ্ছা নেই, থাকলে তার প্রস্তুতি নজরে পড়ত। আর বিজেপির অন্দরে এখন থেকেই অর্ধেক সাধারণ কর্মীরা লেদিয়ে পড়েছেন, ভোটের আগেই কার্যত ভোটে হেরে বসে আছেন। কিন্তু এতটা ডিভিডেন্ট পেয়েও আন্দোলনের চেনা ফর্মুলায় ভোট জেতার পথ ছাড়েননি মমতা। এই ধরনা মঞ্চ দিয়ে পরিবর্তন যাত্রাকে ভ্যানিশ করে দেওয়া বোধহয় সেই ছবিকেই স্পষ্ট করে!

     
  • Link to this news (আজকাল)