জয় সাহা
রাজনীতি বা কূটনীতির মঞ্চ হোক বা ক্রিকেটের ময়দান— ভারত-পাকিস্তান (India Vs Pakistan) মানেই আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক। সীমান্তে প্রতিনিয়ত বারুদের গন্ধ, দু’দেশের সরকারি স্তরে বাগযুদ্ধ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় একাংশের মধ্যে অনবরত কথার লড়াই! কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কি সত্যিই সেই বিদ্বেষের দেওয়াল তোলা সম্ভব? চরম বিপদের দিনে ভিনদেশে এক ভারতীয় যুবকের অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য কথা বলছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ (West Asia War) পরিস্থিতিতে আটকে পড়া এক বাঙালির কাছে ত্রাতা হয়ে উঠলেন দুই পাকিস্তানিই। যোগ্য দোসর হলেন নেপালি এবং বাংলাদেশিরাও। ঠিক যেমন পাড়ায় কোনও বিপদ হলে প্রতিবেশীরাই সবার আগে ছুটে আসেন, তেমনই ভিনদেশে থাকা এই বাঙালি যুবককে রক্ষা করতে ছুটে এসেছিলেন পড়শি দেশের নাগরিকরাই। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথাই তো বলে সব দেশের সব ধর্ম!
বর্ধমান শহরের ছেলে বছর আঠাশের অর্ঘ্য বণিক। পেশায় আইটি কর্মী (IT WORKER) অর্ঘ্য কর্মসূত্রে বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা। একা ঘুরতে (সোলো ট্রিপ) ভালোবাসেন তিনি। ২৭ ফেব্রুয়ারি তেমনই এক ট্রিপে কুয়েতে গিয়েছিলেন অর্ঘ্য। প্ল্যান ছিল সেখান থেকে দুবাই, ওমান, কাতার ঘুরে ভারতে ফেরার। কিন্তু কুয়েতে পৌঁছনোর পরেই শুরু হয় ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাত। আচমকা বন্ধ হয়ে যায় আকাশপথ, বাতিল হয়ে যায় সব উড়ান। বিমানবন্দরেও চলে গোলাগুলি। অচেনা দেশে সম্পূর্ণ একা আটকে পড়েন অর্ঘ্য। চারিদিকে গোলাগুলি আর সাইরেনের শব্দে মৃত্যুভয় ঘিরে ধরে তাঁকে। এই আতঙ্কের মুহূর্তে অর্ঘ্যর সহায় দুই পাকিস্তানি নাগরিক।
তাঁদের সহায়তাতেই বিদেশ-বিভুঁইয়ে বিনা পয়সায় শুধু আশ্রয়ই পাননি তিনি, তাঁদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ অর্ঘ্য বলছেন, ‘পাকিস্তানি বলতেই তো ছেলেবেলা থেকে শুধু জঙ্গি, সন্ত্রাস, গোলাগুলি শেখানো হয়েছে। সেই ধারণা যে কতটা ভিত্তিহীন বুঝতে পেরেছি। দিন তিনেক দাদার মতোই আমাকে আগলে রেখেছিলেন। ওঁরা না–থাকলে এখনও দেশে ফিরতে পারতাম না। বেঁচে থাকতাম কি না সন্দেহ!’ ভারতে ফিরেও দুই পাকিস্তানি আরশাদ ভাই আর আমের ভাইকে ভুলতে পারছেন না তিনি। আফশোস একটাই— সেই আতঙ্কের প্রহরে দু’জনের সঙ্গে তাঁর ছবি তোলা হয়নি আর।
অর্ঘ্য জানাচ্ছেন, ফ্লাইট ক্যান্সেল হওয়ার পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত কুয়েতে প্রথম কয়েকদিন দামি হোটেলে থাকার পরে পকেটে টান পড়ে। নিরুপায় হয়ে ফেসবুকে একটি ট্রাভেল কমিউনিটিতে সাহায্য চান তিনি। প্রথমে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন প্রবাসী নেপালি শ্রমিকরা। নিজেদের ছোট্ট ঘিঞ্জি ঘরে আন্তরিক আতিথেয়তায় অর্ঘ্যের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। ঘরভাড়া বা মুদিখানার খরচ— কোনও কিছুর জন্য এক পয়সাও নিতে রাজি হননি ওই নেপালি যুবকরা। নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই আগলে রেখেছিলেন তাঁকে। কিন্তু দেশে তো ফিরতেই হবে। এক সহযাত্রীর সঙ্গে সড়কপথে কুয়েত সীমান্ত পেরিয়ে কোনওক্রমে সৌদি আরবের রিয়াধে পৌঁছন অর্ঘ্য। সেখান থেকে ফ্লাইটে ভারতে ফেরার টিকিট কাটা ছিল তাঁর। কিন্তু রিয়াধ বিমানবন্দরে পৌঁছনোর মাত্র ২০ মিনিট আগে ই–মেল আসে— ফ্লাইট বাতিল! টানা কয়েকদিনের মানসিক চাপ আর চরম অনিশ্চয়তায় গাড়ির মধ্যেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন অর্ঘ্য।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পরম আত্মীয়ের মতো তাঁর পাশে দাঁড়ান ক্যাবের পাকিস্তানি চালক আরশাদ ভাই। শীতে কাঁপতে থাকা অর্ঘ্যকে নিজের গায়ের জ্যাকেট খুলে পরিয়ে দেন তিনি। তিনিই ফোন করেন রিয়াধের বাসিন্দা পাকিস্তানি বন্ধু আমেরকে। অর্ঘ্যকে তাঁর কাজের জায়গায় নিয়ে যান আমের। সেখানে কর্মরত ছিলেন বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশি শ্রমিক। সেখানে দিন তিনেক নিরাপদে ছিলেন অর্ঘ্য। বাংলাদেশিদের সঙ্গে আলাপ হতেই শুরু হয় এ পার বাংলা-ও পার বাংলার আড্ডা।মাঝরাতে অর্ঘ্যকে পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় ঐতিহ্যবাহী খাবারও খাওয়ান আমের। যেটুকু টাকা অবশিষ্ট ছিল তা দিয়ে অর্ঘ্য বিল মেটাতে গেলে তাঁকে থামিয়ে আমেরের সটান জবাব, ‘আপ মেরে মেহমান হ্যায়। ইয়ে আপকা হি ঘর হ্যায়।’ সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ভিনদেশি, অমুসলিম যুবককে পরম মমতায় নিরাপদ আশ্রয় দেন তাঁরা। এই পর্বে দুই পাকিস্তানির সঙ্গে অনেক রকমের কথা হয় তাঁর।
অর্ঘ্য জানতে চান পাকিস্তান দেশটা কেমন। তার চেয়েও বেশি যেন ভারত নিয়ে আগ্রহী আরশাদ আর আমের। আরশাদের বাড়ি লাহোরের কাছে আর আমের মুলতানের আদি বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে বছর দশেক আছেন রিয়াধে। ভারতে তাঁরা কী ভাবে থাকেন, কোথায় থাকেন, কী খাওয়া–দাওয়া করেন— এমনকী ভারতে কি সবাই গোমূত্র পান করেন, এমনই কথা চলতে থাকে দু’পক্ষের মধ্যে। ওঠে দেশভাগের প্রসঙ্গেও। এই পর্বে একাধিকবার দূতাবাসের সাহায্য চেয়েও কাঙ্ক্ষিত সহায়তা মেলেনি বলে জানাচ্ছেন অর্ঘ্য। অর্ঘ্যর বাবা তাপস কংসবণিক ভারতীয় বায়ুসেনার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। ফৌজি পরিবারের সন্তান হয়েও তথাকথিত ‘শত্রু’ দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পেয়ে তিনি আপ্লুত। আতিথেয়তায় মুগ্ধ অর্ঘ্যের কথায়, ‘কাঁটাতার যে মানুষের মনকে ভাগ করতে পারে না, এই অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।’