১৯৪৬-এ প্রতিষ্ঠিত হয় দাঁতন ভাগবতচরণ হাইস্কুল। মাত্র দু'টি ক্লাসে পঠনপাঠনের স্বীকৃতি মেলে ১৯৪৭-এ। জুনিয়র থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণ ২০০৬-এ। ২০১৫-য় শুরু উচ্চ মাধ্যমিকের পঠনপাঠন। ২০০৫-এ প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন অরবিন্দ দাস। তাঁর উদ্যোগে ভোলবদল হতে শুরু করে স্কুলের। পড়াশোনার সঙ্গে সামাজিক, সংস্কৃতি-সহ খেলাধূলার মানেরও উন্নতি হয়।
সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর
যুক্তি খণ্ডিত হলো পাল্টা যুক্তিতে। তত্ত্বের চাপে নতিস্বীকার করল নাছোড়বান্দা তথ্যও। এ ভাবেই বেশ কিছুক্ষণের 'যুদ্ধ' শেষে শেষ হাসিটা হাসল মেয়েরাই। জয় হলো মেধার। ছেলেদের পিছনে ফেলে বিতর্কের ময়দানে ঝনঝনিয়ে উঠল যুক্তিতে শান দেওয়া মেয়েদের তরবারিই। গত ৮ ডিসেম্বর দাঁতন ভাগবতচরণ হাইস্কুলে (Dantan Bhagavatcharan High School) আয়োজন করা হয়েছিল এক বিতর্কসভার। বিষয়- 'বাল্যবিবাহের কারণ দারিদ্র নয়, অসচেতনতা'। 'এই সময়' সংবাদপত্রের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিতর্কসভায় উঠে এল পক্ষে-বিপক্ষের নানা মত। বাল্যবিবাহ (Child Marriage) দারিদ্রের কারণে নয়, অসচেতনতাই যে অন্যতম প্রধান কারণ সেই বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে জোরাল মত প্রকাশ করল পড়ুয়ারা।
বিতর্কে যোগ দিয়েছিল বিদ্যালয়ের নবম থেকে একাদশ শ্রেণির ১২ জন ছাত্রছাত্রী। বিষয়ের পক্ষে ছিল ছ'জন এবং বিপক্ষেও ছ'জন। প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রথম দিকে কিছুটা জড়তা থাকলেও অনুষ্ঠান যত এগিয়েছে, ততই জড়তা কাটিয়ে যুক্তি দিয়ে নিজেদের মতকে সাবলীল ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে তারা। বিষয়ের বিপক্ষে প্রথম বক্তা সুস্মিতা দাসের বক্তব্য, 'মেয়েদের শিক্ষার স্বপ্ন বিলাসিতা। আগে ধনী পরিবারেও বাল্যবিবাহ হতো। কন্যাশ্রীর টাকা যথেষ্ট? এই অর্থ সাময়িক স্বস্তি। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থাকলেও দারিদ্র না ঘুচলে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না।' প্রথম বক্তার যুক্তিকে খণ্ডন করে বিষয়ের পক্ষে একাদশ শ্রেণির সুস্মিতা পাত্র বলে, 'বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি শুধুমাত্র অসচেতনতার কারণে। দারিদ্র সেখানে অজুহাত মাত্র। জঙ্গলমহলে এখনও বাল্যবিবাহ হয়। মানুষকে সচেতন করতে না পারলে এই সামাজিক ব্যাধি বন্ধ করা যাবে না।'
এর পরে যুক্তি পাল্টা যুক্তির লড়াইয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যায় সুধাবিন্দু গিরি, সায়ন্তনী পাল মৌরিন ঘোড়াই, সঞ্চিতা বেরা, তন্ময় দাস মহাপাত্ররা। আলোচ্য বিষয়ের পক্ষে দশম বেরার যুক্তি, 'সমাজে পণপ্রথা আজও রয়েছে। মেয়েদের যত কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হবে তত কম পণ দিতে হবে বাবা-মাকে, এই ধারণা থেকে বাল্যবিবাহে ঝুঁকছেন অনেক বাবা-মা।' পক্ষে ও বিপক্ষের যুক্তিকে জমে উঠেছিল বিতর্কসভা। বিচারক ছিলেন শিক্ষক, সঞ্চালক সমাজসেবী অখিলবন্ধু মহাপাত্র, সাহিত্যিক অতনুনন্দন মাইতি, প্রাক্তন শিক্ষক ও লেখক সূর্য নন্দী। তিন বিচারকের বিচারে আলোচা বিষয়ের বিপক্ষে বক্তব্য রেখে প্রথম হয় দ্বাদশ শ্রেণির সায়ন্তনী পাল। বিষয়ের পক্ষে বলে দ্বিতীয় হয় দশম শ্রেণির মৌরিন ঘোড়াই। তৃতীয় স্থান দখল করে বিপক্ষের বক্তা সুস্মিতা দাস। দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীরা।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক অরবিন্দ দাস বলেন, 'এই সময়' সংবাদপত্রের এমন একটি ভাবনা আমাদেরকে প্রেরণা জুগিয়েছে। আমরা ভাবতে পারিনি ছাত্রছাত্রীরা এত সুন্দর ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। ওদের যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা শুনে আমরা মুগ্ধ। এমন বিতর্ক সভা সব স্কুলে করা উচিত। শিক্ষা মানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়। এমন বিতর্কসভা থেকে অনেক শিক্ষা অর্জন করার আছে। যা বাস্তব জীবনে কাজে লাগবে।' বিচারক অখিলবন্ধু মাহাপাত্র বলেন, 'দু'-এক জন বলতে গিয়ে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিযোগী পক্ষে-বিপক্ষে এমন যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, সিদ্ধান্ত নিতে সময় লেগেছে।'