সুমন ঘোষ খড়্গপুর:
দুয়ারে কড়া নাড়ছে নির্বাচন। যে সময়ে গ্রামে-গঞ্জে ভোটের প্রচারে হাওয়া তুলে দেওয়ার কথা, সেই সময়ে হঠাৎ যেন থমকে গিয়েছে তৃণমূলের প্রচার ও জনসংযোগ কর্মসূচি। অথচ, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) (SIR) জেরে প্রতিটি বিধানসভা থেকেই নাম বাদ পড়েছে বহু ভোটারের। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল বিধায়কদের সে ভাবে প্রচার ও জনসংযোগে দেখা যাচ্ছে না কেন? তৃণমূল (TMC) সূত্রেই জানা গিয়েছে, এর নেপথ্যে রয়েছে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা না হওয়া। ফলে, কোনও বিধায়কই নিশ্চিত নন যে, দল এ বারও তাঁকে প্রার্থী করবে। আবার প্রার্থী করলেও তাঁকে একই বিধানসভায় টিকিট দেওয়া হবে কি না তা নিয়েও সংশয়ে আছেন অনেকে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এমন ছবিই দেখা গেল পশ্চিম মেদিনীপুরে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও শাসকদল, তৃণমূলের বিধায়করা জোরকদমে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যে সময়ে বিজেপি পরিবর্তন সঙ্কল্প যাত্রার রথ বের করেছে, সেই সময়ে তৃণমূলের বিধায়করা যেন কেমন 'মনমরা'।
ক'দিন আগের জনসংযোগের চনমনে ছবিও উধাও। বেশিরভাগ সময় তাঁরা দলীয় অফিসে কাটাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে দু'একটা মিটিং, মিছিলের মতো দলীয় কর্মসূচি করছেন নিতান্তই বাধ্য হয়ে। তৃণমূল সূত্রে খবর, প্রার্থী তালিকা ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেউ আর জোর কদমে প্রচারে নামতে চাইছেন না। তার নেপথ্যে কারণও রয়েছে। দলের অন্দরেই শোনা যাচ্ছে, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ১৫টি আসনের মধ্যে অন্তত পাঁচটি আসনে নাকি প্রার্থী বদলের সম্ভাবনা রয়েছে। আবার কোনও ক্ষেত্রে এক বিধানসভার প্রার্থীকে এ বার অন্যত্র প্রার্থী করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু বিষয়টি এতটাই গোপনে রাখা হয়েছে যে, কে থাকছেন আর কে যাচ্ছেন তা কারও কাছেই স্পষ্ট নয়। আবার কারা নতুন মুখ হিসেবে টিকিট পাবেন তা-ও নিশ্চিত নয়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক বিধায়কের কথায়, 'প্রচারে তুমুল ঝড় তোলার পর যদি দেখা যায় টিকিটই মিলল না, তখন কী হবে? লোকে হাসাহাসি তো করবেই। নিজেরও মন খারাপ হবে।
সেই আশঙ্কায় বিধায়করা এই সময়টা ওই ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে কাটাচ্ছেন। আবার যাঁরা নতুন মুখ হিসেবে আসবেন বলে ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাঁদেরও একই দশা। ফলে কেউই সে ভাবে প্রচারে নামতে পারছেন না। সকলেই ভিতরে ভিতরে তৈরি আছেন। প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন।' এ বারের নির্বাচন যে কঠিন তা মানছেন জেলা তৃণমূলের নেতা ও বিধায়কদের একটা বড় অংশ। তার প্রধান কারণ যে 'সার' তা-ও মেনে নিচ্ছেন তাঁরা। 'সার'-সৌজন্যে বহু ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। দাঁতন বিধানসভার কথাই ধরা যাক। ২০২১-এ মাত্র ৬২৩ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের বিক্রমচন্দ্র প্রধান। সেখানে এ বার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে ৯০৭২ জনের। নারায়ণগড় বিধানসভায় ২৪২১ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের সূর্যকান্ত অট্ট। এ বার সেখান থেকে নাম বাদ পড়েছে ১১ হাজার ৭০৮ জনের। আবার উল্টোটাও রয়েছে।
ঘাটাল বিধানসভা থেকে বিজেপির শীতল কপাট জিতেছিলেন মাত্র ৯৬৬ ভোটে। সেখানে নাম বাদ পড়েছে ৯৯০৮ জনের। আবার খড়্গপুর সদর বিধানসভাতেও বিজেপির হিরণ চট্টোপাধ্যায় (BJP's Hiran Chatterjee) জিতেছিলেন ৩৭৭১ ভোটে। সেখানে এ বার ৪৪ হাজার ৫ জনের নাম বাদ গিয়েছে। ফলে জেতা আসন বাঁচানোর পাশাপাশি হারানো আসন পুনরুদ্ধারে তৃণমূলকে আরও অনেক সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন দলীয় নেতৃত্বই। কারণ, এর বাইরেও জেলায় ১ লক্ষ ৩ হাজার ৪৯৬ জনের নাম বিবেচনাধীন। তাঁদের কত জনের নাম শেষ পর্যন্ত তালিকায় থাকবে তা সকলেরই অজানা। প্রচারে বিধায়কদের কিছুটা গা-ছাড়া মনোভাবের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি সুজয় হাজরাও। তিনি বলছেন, 'এটা ঠিক যে বিধায়কদের অনেকেই কিছুদিন থেকে জনসংযোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন না। আমি প্রত্যেককেই বলেছি, দল আপনাদের কথা ভেবেছিল বলেই আজ আপনারা বিধায়ক। দল এ বার অন্য কারও কথা ভাবলে তিনি বিধায়ক হবেন। তাই বলে প্রচারে বা জনসংযোগে খামতি রাখা উচিত নয়। সবার আগে দল। দলকে জেতাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কারণ, 'সার'-এর কারণে অনেক যোগ্য ভোটারেরও নাম বাদ পড়েছে।'