পিরিয়ড লিভ বাধ্যতামূলক করা হলে আখেরে তা মহিলাদের কেরিয়ারের জন্যই ক্ষতিকর হবে— শুক্রবার এমনই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারক জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ। তা নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক। সুপ্রিম কোর্টের যুক্তি, প্রতি মাসে মহিলাদের সবেতন ছুটি দিতে বাধ্য করা হলে মহিলা কর্মী নিয়োগের হার কমে যাবে। এই ব্যাপারে কেন্দ্রকে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়ে PIL খারিজ করেছে শীর্ষ আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে খুশি নন প্রাক্তন অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ। এই সময় অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘এর আগেও গৃহপরিচারিকাদের নূন্যতম পারিশ্রমিকের আওতায় আনার বিষয়ে কেস করা হলেও, এই একই যুক্তি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট মহিলাদের কাজের পরিসর সঙ্কুচিত হয়ে যাবে তা নিয়ে অত্যন্ত ভাবিত। তাই জন্য মহিলাদের অধিকারের জায়গাটি মুলতুবি থাক। এটাই যদি সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ হয়, তা হলে আমার তীব্র আপত্তি এবং অসুবিধা রয়েছে। আমার মনে হয় না একদিনের ছুটির জন্য মহিলাদের চাকরির পরিসর আরও ছোট হয়ে যেতে পারে।’
প্রসঙ্গত, ঋতুস্রাবকালীন ছুটি নিয়ে আলোচনা এই প্রথম নয়। বিশ্বের বহু দেশেই সবেতন পিরিয়ড লিভ চালু রয়েছে। যেমন ধরুন, স্পেনে রয়েছে ৩-৫ দিনের সবেতন ঋতুস্রাবকালীন ছুটি। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে মাসে ২ দিন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ও জ়াম্বিয়ায় মাসে ১ দিন ছুটি পান মহিলারা। এছাড়াও তাইওয়ানে বছরে ৩ দিন অর্ধ-বেতনে এবং জাপানেও ছুটি দেওয়া হয়, তবে তা অবৈতনিক। শুধু বিদেশ কেন, ভারতেও বেশ কিছু রাজ্যে রয়েছে পিরিয়ড লিভ নেওয়ার সুযোগ।
এই বিষয়ে এই সময় অনলাইন যোগাযোগ করেছিল কলকাতার প্যাডমান শোভন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ছুটির আর্জি কোর্টে খারিজ হয়ে গেলেও আশাবাদী শোভন। তাঁর মতে, একদিন না একদিন পিরিয়ড লিভ চালু হবে এবং সেই দিনটার অপেক্ষায় থাকবেন। শোভন বলেন, ‘আমাদের দেশে কোনও জিনিস চালু করতে হলে অনেক লড়াই করতে হয়। মহিলাদের সমান অধিকারের জন্য লড়াই চললেও বাস্তব ছবিটা আলাদা। মানুষের বেসিক মাইন্ড সেট পরিবর্তন করা দরকার। এই প্রস্তাব আসার পরেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। মহিলাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা, অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করার কোনও যুক্তি নেই। যাঁরা এটা করছেন মনে রাখবেন তাঁকেও কোনও কম্পিউটার তৈরি করেনি। নারীর শরীর থেকেই জন্ম হয়েছে। তবে আশার কথা সুপ্রিম কোর্টের মতো জায়গায় এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সব কিছুর ভালো এবং খারাপ দিক থাকে। তবে মানুষ পিরিয়ড নিয়ে খোলাখুলি কথা বলছে, ট্যাবু ভাঙছে, এটাই বড় বিষয়।’
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কেরালায় সব স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রীদের জন্য পিরিয়ড লিভ শুরু করার ঘোষণা করে সরকার। তার জন্য স্কুল-কলেজে অ্যাটেনডেন্সে অতিরিক্ত ২ শতাংশ ছাড়ের কথাও বলা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে বিহারে শুরু হয়েছিল মাসে ২ দিন ঋতুস্রাবকালীন ছুটি। এই ছুটির চল রয়েছে ওডিশাতেও। ২০২৫ সালে কর্ণাটকে ১৮-৫২ বছর বয়সী সব মহিলা কর্মীদের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে বছরে ১২ দিন (প্রতি মাসে ১ দিন) করে সবেতন ঋতুকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হয়। যদিও এই ছুটি কেবল সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের জন্যই প্রযোজ্য। যা নিয়ে রয়েছে বিতর্কও।
শাশ্বতীর মতে, ছুটি চালু করলেই কিন্তু হলো না। তার সুবিধা যাতে সব স্তরের সব মহিলা পান সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ছুটি চালু হলে এক বৈষম্য সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে মাত্র ৬ শতাংশ কর্মরত মহিলা সংগঠিত ক্ষেত্রে রয়েছেন। বাকি ৯৪ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে জড়িত। তাঁরা বহু ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটিও পান না। অথচ মহিলাদের সংগঠিত ক্ষেত্রের কাজ ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। তাই ছুটি দিলেও, সেই সুবিধা ৯৪ শতাংশ মহিলাই পাবেন না। তাই সুপ্রিম কোর্টের উচিত রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দেওয়া, যাতে তারা নিশ্চিত করে অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলারাও সব সুবিধা পান সেটা দেখা। সুপ্রিম কোর্টই কিছু দিন আগে বলেছে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য মহিলাদের মৌলিক অধিকার। আমি চাই মহিলারা যেন ঋতুকালীন সময়ে পরিশ্রুত শৌচালয়, পোশাক বদলানো বা প্যাড বদলানোর জন্য গোপনে অবসরটুকু পান, সেটাই আগে দেখা উচিত।’