• গ্যাস সঙ্কটে মা ক্যান্টিন বন্ধ, মুড়ি খেয়ে কাটছে দিন
    এই সময় | ১৩ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: রান্নার গ্যাসের (Cooking gas) অভাবে বৃহস্পতিবার থেকে হুগলির আরামবাগ শহরে দু'-দু'টি মা ক্যান্টিন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলো। সাধারণ মানুষের অবগতির জন্য এই মর্মে আরামবাগ পুরসভার (Arambagh Municipality) তরফে নোটিসও ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ফলে এ দিন অনেকেরই দুপুরের খাবার জোটেনি। কারও অর্ধাহারে দিন কেটেছে। কেউ আবার দুপুরে শুকনো মুড়ি কিংবা ছাতু খেয়ে পেট ভরিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, করোনার সময় থেকে আরামবাগ শহরে দু'টি মা ক্যান্টিন চালাচ্ছে আরামবাগ পুরসভা। তার মধ্যে একটি রয়েছে আরামবাগের ভবঘুরে ভবনে। আর একটি রয়েছে আরামবাগ হাসপাতাল চত্বরে।

    পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, দুই জায়গা মিলিয়ে ৭০০-৭৫০ মানুষ প্রতিদিন খাওয়া-দাওয়া করত। মেনুতে থাকত ভাত, ডিম, ডাল, সব্জি। মাত্র পাঁচ টাকার বিনিময়ে পেটপুরে খাবার খেতে পাওয়া যেত মা ক্যান্টিন থেকে। যাঁদের হোটেলে কিংবা রেস্তোঁরায় বেশি দাম দিয়ে খাবার কেনার ক্ষমতা নেই, মূলত তাঁরাই মা ক্যান্টিনের খাবার খেতেন। তাঁদের কেউ রিকশ ও টোটো চালক, হকার কিংবা দিনমজুর। গ্যাসের সঙ্কটে মা ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরাই সবথেকে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে আরামবাগ ভবঘুরে মা ক্যান্টিনে রোজ দুপুরে খাবার খেতেন চম্পা সাঁতরা, স্বর্ণ গোস্বামীরা। পেশায় ভিক্ষুক স্বর্ণ এ দিন মা ক্যান্টিনে গিয়ে জানতে পারেন, গ্যাসের অভাবে রান্না হয়নি। সেজন্য ক্যান্টিন আপাতত বন্ধ থাকবে।

    স্বর্ণের কথায়, 'মা ক্যান্টিন কবে খুলবে কেউ জানে না। মা ক্যান্টিনে কম পয়সায় খেতে পেতাম। হোটেলে খাওয়ার মতো অত পয়সা নেই। তাই দুপুরে শুকনো মুড়ি খেয়েছি।' চম্পা বলেন, 'মা ক্যান্টিনের ম্যানেজার বলেছে, গ্যাস নেই তাই রান্না বন্ধ। জানি না, কী করে খাবার জুটবে।' আরামবাগ পুরসভার মা ক্যান্টিনের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন কৌশিক দে। তিনি বলেন, 'কী ভাবে ক্যান্টিন চালাব? গ্যাসের কোনও জোগান নেই। গ্যাস আনতে গিয়েও খালি হাতে ফিরে এসেছি। কবে আবার স্বাভাবিক হবে জানি না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা নোটিস ঝুলিয়েছি।' পুরকর্তারা জানাচ্ছেন, গ্যাসের জোগান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত মা ক্যান্টিনের খাবার কাঠের উনুনে বানানো যায় কি না, সে ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা চলছে। যদিও দিনের পর দিন জ্বালানি কাঠ জোগানো মুশকিল। ফলে মা ক্যান্টিনের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। আরামবাগ পুরসভার চেয়ারম্যান সমীর ভান্ডারি বলেন, 'গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে আপাতত মা ক্যান্টিন বন্ধ রাখা হয়েছে। মূলত গরিব মানুষরাই ওখানে খেতেন। রোজ কয়েকশো মানুষ মা ক্যান্টিনে খাওয়া-দাওয়া করতেন। মা ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা সত্যিই খুব অসুবিধায় পড়েছেন। কেউ কেউ তো রাস্তায় মুড়ি কিনে খাচ্ছেন। গ্যাসের অভাবে হোটেলও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে লোকে খাবে কোথায়?'

    আরামবাগের বিজেপি বিধায়ক মধুসুদন বাগ বলেন, 'তৃণমূল নেতারা অহেতুক প্যানিক সৃষ্টি করছেন। যুদ্ধের আবহে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগবে। সকলেই বছরে ১২টি করে সিলিন্ডার পাবেন। সিলিন্ডার স্টক করার দরকার নেই। মা ক্যান্টিন বন্ধ রেখে তৃণমূল পরিচালিত আরামবাগ পুরসভা প্যানিক সৃষ্টি করছে।' করোনার সময় থেকে বৈদ্যবাটি পুরসভা মা ক্যান্টিন চালু করে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এখানে রোজ গড়ে ১৫০-১৬০ জন লোক খাবার খেতে আসেন। তবে গ্যাসের সরবারহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় মা ক্যান্টিন কতদিন চলবে, তা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা। বৈদ্যবাটি পুরসভার চেয়ারম্যান পিন্টু মাহাতো বলেন, 'এখন আমাদের যে গ্যাস সিলিন্ডার মজুত আছে, তাতে হয়তো দু'-দিন চলবে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন মিড-ডে মিল, মা ক্যান্টিনের মতো জরুরি পরিষেবাগুলি যাতে বন্ধ না হয়, তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হবে।'

    বাতিল প্লাস্টিকের বদলে মা ক্যান্টিন থেকে বিনা পয়সায় খাবার দেওয়া চালু করেছে ভদ্রেশ্বর পুরসভা। এখানে রোজ গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ খাবার খেতে আসেন। কিন্তু গ্যাসের জোগান থমকে যাওয়ায় মা ক্যান্টিন চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন ভদ্রেশ্বর পুরসভার চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী। তিনি বলেন, 'আমরা মুখ্যমন্ত্রীর উপরে ভরসা রাখছি। এখন পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' উত্তর হাওড়ার বাঁধাঘাট, কৈপুকুর, হাওড়া জেলা হাসপাতাল এবং দক্ষিণ হাওড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতাল মিলিয়ে হাওড়া শহরে মোট চারটি মা ক্যান্টিন চলে। হাওড়া হাসপাতাল এলাকায় মা ক্যান্টিন থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ জন খাবার সংগ্রহ করেন। কৈপুকুর থেকে রোজ গড়ে ১৫০-২০০ জন খাবার নেন। কৈপুকুর ও হাওড়া জেলা হাসপাতাল এলাকায় মা ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে 'নটরাজ স্বনির্ভর গোষ্ঠী'। এই গোষ্ঠীর সভাপতি টুম্পা দাস বলেন, 'বর্তমানে যে গ্যাস মজুত রয়েছে, তাতে তিন থেকে চার দিন চলবে। তার পরেও যদি গ্যাস না পাওয়া যায়, তা হলে কাঠ জ্বালিয়ে হলেও আমরা রান্না চালিয়ে যাব।'

  • Link to this news (এই সময়)