• রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে বঙ্গের আমলা, আইপিএসকে ডেপুটেশনে ডাকল কেন্দ্র
    এই সময় | ১৪ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়, কলকাতা ও নয়াদিল্লি: রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর (President Draupadi Murmu) 'অপমান' ইস্যুতে বিতর্কের জল আরও গড়াল। শিলিগুড়িতে রাষ্ট্রপতির সফর চলাকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক (District Magistrate of Darjeeling) মণীশ মিশ্র ও শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি সুধাকরকে সেন্ট্রাল ডেপুটেশনে চেয়ে রাজ্য সরকারকে চিঠি দিল কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (Home Ministry)। এ নিয়ে নবান্নের বক্তব্যও তলব করেছে কেন্দ্র। হঠাৎ কেন দুই আমলা ও পুলিশ আধিকারিককে কেন্দ্র তলব করল, তার কোনও ব্যাখ্যা না–দেওয়া হলেও এর সঙ্গে গত ৭ মার্চ রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে বিতর্কের যোগ দেখছেন অনেকেই। প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠান চলাকালীন পাঁচ দফা গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে এই দুই আধিকারিকের বিরুদ্ধে। ওই দিন‍ আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাষ্ট্রপতি মুর্মু শিলিগুড়িতে গিয়েছিলেন। শিলিগুড়ির বিধাননগর থেকে ওই অনুষ্ঠানের জায়গা গোঁসাইপুরে সরিয়ে দেওয়া নিয়েও প্রকাশ্যেই বেনজির ভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। ওই সফরে অনুপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Mamata Banerjee) । যা নিয়ে রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের পরে দেশজুড়ে বিতর্ক হয়েছে। রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে নিশানা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাল্টা তোপ দাগেন মমতাও।

    এই টানাপড়েনের জেরেই কেন্দ্র এই দুই অফিসারকে সেন্ট্রাল ডেপুটেশনে তলব করল মনে করছেন অনেকে। রাষ্ট্রপতির সফর চলাকালীন তাঁর যাত্রাপথের নিরাপত্তা-সহ বেশ কিছু বিষয়ে গাফিলতি ছিল বলে মত কেন্দ্রীয় প্রশাসনের একাংশের। এ দিন চিঠি আসার পরে মণীশ মিশ্রকে জেলাশাসক পদ থেকে সরিয়ে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের স্পেশাল সেক্রেটারি পদে বদলি করেছে নবান্ন। বদলি করা হতে পারে সুধাকরকেও।

    রাষ্ট্রপতির অপমানের ইস্যুকে সার্বিক ভাবে দেশের জনজাতি, উপজাতিভুক্ত মহিলাদের অপমান হিসেবে চিহ্নিত করে তৃণমূলকে নিশানা করেছে বিজেপি। এই আবহে এ দিন রাজ্যের পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য সাংস্কৃতিক এবং উন্নয়ন বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুক্রবার এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মুন্ডা, কোরা, ডোম, কুম্ভকার এবং সদগোপ জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত পাঁচটি পৃথক বোর্ড গঠন করতে চাইছে তাঁর সরকার। মমতার বক্তব্য, বোর্ডগুলি ওই জনগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব ভাষা এবং ঐতিহ্যকে যেমন রক্ষা করবে, তেমনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের উন্নতির বিষয়টিও দেখবে। তিনি এ-ও জানিয়েছেন যে, রাজ্যের তৃণমূল সরকার ২০১৩ থেকেই আর্থ-সামাজিক দিক থেকে সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীগুলির সামগ্রিক উন্নয়নে বোর্ড গঠন করেছে। মমতা যে পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য বোর্ড গঠনের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে 'মুন্ডা' এবং 'কোরা' জনগোষ্ঠীর মানুষ তফসিলি জনজাতিভুক্ত (এসটি)। 'কুম্ভকার' এবং 'সদগোপ' অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ভুক্ত (ওবিসি)। আর 'ডোম' জনগোষ্ঠীর মানুষ তফসিলি জাতিভুক্ত। রাষ্ট্রপতির অপমান ইস্যুতে বিতর্কের মধ্যে এই ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

    কিন্তু এতে বিতর্কের অবসান হবে?

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যে ভাবে দার্জিলিংয়ের ডিএম এবং শিলিগুড়ির সিপিকে কেন্দ্র ডেপুটেশনে চেয়ে পাঠিয়েছে, তাতে কেন্দ্র–রাজ্য টানাপড়েন আরও বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে নিয়ম কী বলছে? পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের একাংশ বলছেন যে, আইএএস–আইপিএসরা যেহেতু সেন্ট্রাল ক্যাডারের অফিসার, তাই তাঁদের যে কোনও প্রয়োজনে কেন্দ্র ডেপুটেশনে চেয়ে পাঠাতেই পারে। দুই অফিসার রাষ্ট্রপতির প্রোটোকল ভেঙেছেন বলে রাজ্যও মনে করে থাকলে তাঁদের 'রিলিজ়' করতে পারে। আবার ডেপুটেশনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানও করতে পারে রাজ্য। তাতে দু'পক্ষের মধ্যে তাতে সংঘাত আরও বাড়বে। আবার দুই অফিসার কেন্দ্রের ডেপুটেশনে যোগ না–দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ করতে পারে কেন্দ্র।

    আমলা–পুলিশকর্তাদের ডেপুটেশনে পাঠানো নিয়ে তরজা এর আগেও হয়েছে কেন্দ্র–রাজ্যের। ২০২০–তে বিজেপির তৎকালীন সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডার কনভয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে রাজ্যের শাসকদলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার পরে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক, রেঞ্জ ডিআইজি ও আইজিকে সেন্ট্রাল ডেপুটেশনে তলব করেছিল কেন্দ্র। কিন্তু রাজ্য সে বার তাদের অফিসারদের ছাড়েনি। এ নিয়ে কিছুদিন বিতর্ক হলেও তারপরে অবশ্য তা ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে ২০২১–এ ঘূর্ণিঝড় 'ইয়াস' পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক চলাকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যসচিব কেন্দ্রের কোপে পড়েন। সেই সময়ে তৎকালীন মুখ্যসচিবকে দিল্লিতে প্রশাসনিক কর্মিবর্গ দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছিল। তা না–করায় ওই প্রবীণ আমলার অবসরকালীন সুযোগ–সুবিধা কেন্দ্র আটকে দেয়। তা নিয়ে এখনও মামলা চলছে। প্রশাসনিক কর্তারা বলছেন, এ বারও মণীশ ও সুধাকর কেন্দ্রের নির্দেশ মেনে ডেপুটেশনে না–গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পথে হাঁটতে পারে কেন্দ্র। আবার কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত বদলের আর্জি জানাতে পারে রাজ্য।

    এই টানাপড়েনের মধ্যে আগামী ১৬ মার্চ দেশের সব রাজ্যের সাংসদদের সঙ্গে প্রাতরাশে মিলিত হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু৷ বাংলার শাসকদল তৃণমূলের সাংসদদেরও এই প্রাতরাশে যোগদান করার জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে৷ সূত্রের দাবি, তৃণমূল সাংসদরা এই প্রাতরাশ বৈঠকে যোগ দেবেন না৷ তাঁদের যুক্তি, পবিত্র রমজান মাসে যখন রোজা রেখে সারাদিন নির্জলা উপবাস করছেন দলের সংখ্যালঘু সাংসদরা, তখন তাঁদের ফেলে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রাতরাশে যোগদান অনুচিত৷ এই মর্মে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার মুখ্য সচেতক নাদিমূল হক৷ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে জোড়াফুল সাংসদদের একটি প্রতিনিধি দল দেখা করতে চায় বলে জানিয়ে আলাদা করে চিঠি দিয়েছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও'ব্রায়েন। এখনও তার জন্য সময় দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রপতি ভবনের তরফে। ফের তৃণমূলের সংসদীয় নেতৃত্ব চিঠি দিতে পারেন বলে খবর। এ নিয়ে কটাক্ষের সুরে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, 'সময় দেননি ভালোই করেছেন (রাষ্ট্রপতি)। ওরা (তৃণমূল) আর বেশিদিন নেই।'

  • Link to this news (এই সময়)