• কার ২৫ দিন, কারই বা ৪৫! প্রশ্নে বিভ্রান্তি, গ্রাম-শহরের সংজ্ঞায় ফেঁসে সিলিন্ডার ডেলিভারি
    এই সময় | ১৪ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: আশ্বাসের প্রতিফলন কি আদৌ দেখা যাচ্ছে বাস্তবে? যদি সব ঠিকই থাকে, তা হলে এলপিজি-তে এই টান কেন? কেনই বা দু'টি সিলিন্ডার বুকিংয়ের মধ্যে সময়সীমা বাড়ানো হলো? কেনই বা হাজার আশ্বাসবাণী দিয়েও মানুষের উদ্বেগে রাশ টানা যাচ্ছে না?

    রান্নার গ্যাসের সঙ্কট (Cooking Gas Crisis) নিয়ে শুক্রবার দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষের এমনই প্রশ্ন উঠে এলো। আর এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন সমস্যা। ডিস্ট্রিবিউটরদের একটি বড় অংশের প্রশ্ন, শহুরে আর গ্রামীণ উপভোক্তার মধ্যে কীসের ভিত্তিতে পার্থক্য করে ২৫ দিন আর ৪৫ দিনের নিয়ম জারি করল সরকার? তাঁদের দাবি, এই বিভাজন পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ কোন গ্রাহক 'গ্রামীণ' আর কে 'শহুরে' — তার পরিষ্কার কোনও সংজ্ঞা নেই ডিলারদের কাছে। ফলে কে ২৫ দিন আর কে ৪৫ দিনের ব্যবধানে রান্নার গ্যাস পাবেন, সেটা না গ্রাহক, না ডিলার — কেউই স্পষ্ট করে জানেন না। তাতে পুরো পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হচ্ছে বলে দাবি ডিলার এবং গ্রাহকদের একাংশের। শুধু তা-ই নয়, কেনই বা এই বিভাজন করা হলো, তার কোনও ব্যাখ্যা এ দিন পর্যন্ত কেন্দ্রের তরফে দেওয়া হয়নি।

    এই অবস্থায় এ দিনও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের জয়েন্ট সেক্রেটারি সুজাতা শর্মা দাবি করেছেন, গ্যাসের সাপ্লাই নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে। অযথা উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। তবে সেই সঙ্গে তিনি এলপিজি-র (LPG) উপর থেকে চাপ কমাতে (লিক্যুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) পিএনজি-র (পাইপড ন্যাচরাল গ্যাস) ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, চাপ যদি না-ই থাকে, তা হলে কেন এই পরামর্শ দিতে হচ্ছে?

    তবে খানিকটা স্বস্তি দিয়ে ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ ফাতালি শুক্রবার বলেছেন, হরমুজ় প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে ভারতীয় জাহাজগুলিকে সেফ প্যাসেজ দেওয়া হবে। তাঁর কথায়, 'ভারত আমাদের বন্ধু। আগামী দিনে, হয়তো বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনারা তার প্রতিফলন দেখতে পাবেন।' এর পরেই জানা যায়, হরমুজ় দিয়ে 'শিবালিক' নামে একটি জাহাজকে গাইড করে ভারতে নিয়ে আসছে ভারতীয় নৌসেনা। ওই জাহাজে ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি রয়েছে বলে সূত্রের খবর।

    রাশিয়াও স্বস্তি দিয়েছে নয়াদিল্লিকে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের রুশ রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ জানিয়েছেন, ভারতকে এলএনজি সরবরাহ করতে তৈরি। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেই এলএনজি সরবরাহ নিয়ে চুক্তি হয়েছিল নয়াদিল্লির সঙ্গে। তবে নিষেধাজ্ঞার জেরে তা থমকে যায়। একই সঙ্গে ভারতের রুশ তেল কেনার পক্ষেও সওয়াল করেছেন আলিপভ। তাঁর সাফ কথা, তেল কেনার জন্য ভারতের কোনও দেশের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যেই ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।

    প্যানিক কেন?

    ডিলারদের বক্তব্য, সঙ্কটের একটি কারণ অবশ্যই সাপ্লাই। তাঁদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের ফলে বুকিংয়ের হার এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিতে যে পরিমাণ সাপ্লাই প্রয়োজন, সেটা নেই। মধ্য কলকাতার এক গ্যাস সরবরাহকারী নবীন চৌবে বলেন, 'আগে আমাদের অফিসে মাসে ৪০০-৫০০ বুকিং হতো। এখন হাজার ছাড়াচ্ছে। কিন্তু আগে ৫২৫টি সিলিন্ডারের গাড়ি আসত। এখনও সেটাই আসছে।' সল্টলেকের এক ডিলার সংযুক্তা সাহার কথায়, 'কর্মাশিয়াল গ্যাস একেবারেই আউট অফ স্টক। প্রায়ই বুকিং সিস্টেম ক্র্যাশ করছে। ফেব্রুয়ারির শেষ ১৩ দি‍নের তুলনায় মার্চের প্রথম ১৩ দিনে বুকিং অন্তত ১৫ গুণ বেড়েছে।'

    তবে সব থেকে বড় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে কোন গ্রাহক 'গ্রামীণ' আর কোন গ্রাহক 'শহুরে', তা নিয়ে। ডিলারদের বক্তব্য, অনেক এলাকা আছে যেগুলি কাগজেকলমে 'গ্রামীণ', কিন্তু জীবনযাপনে পুরোদস্তুত শহুরে। ফলে কাঠ-ঘুঁটে-গুলের উনুনে মতো বিকল্প জ্বালানি দিয়ে রান্নার চল (সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় যেমন দেখা যায়) সেখানে একেবারেই নেই। প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে কী হবে? পূর্বাঞ্চলের এইচপি গ্যাস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সঞ্জয় আগরওয়ালের বক্তব্য, 'একাধিক এলাকায় রাস্তা বা রেললাইনের এ পার-ও পারের গ্রাহকরা জীবনযাপনের ধারায় শহুরে ও গ্রামীণ। এ বার বলুন, কী করে বুঝব কে গ্রামীণ গ্রাহক আর কে শহুরে। গ্রাহকরাই বা বুঝবেন কী করে? পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক কী ভাবে গ্রাহকদের এই পৃথকীকরণ করল আমরা জানি না। আমরা কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের এই অসুবিধের কথা জানিয়েছি।' অল ইন্ডিয়া এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটার্স ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিজন বিশ্বাসের কথায়, 'রাজীব গান্ধী এলপিজি বিতারক প্রকল্পের অধীনে যাঁরা ডিস্ট্রিবিউটারশিপ পেয়েছিলেন, তাঁদের আওতায় গ্রাম ও শহর নির্বিশেষে গ্রাহক আছেন। এই ডিলারদের এলাকায় উভয় ধরনের গ্রাহকই থাকবে। কে ২৫ দিনে বুক করবেন আর কে ৪৫ দিনে — সেটা বোঝা সম্ভব হবে কী ভাবে?'

    সরব বিরোধীরা

    গ্যাসের দাম নিয়ে শুক্রবার সংসদে বিক্ষোভ দেখায় তৃণমূল কংগ্রেস। সরকারকে নিশানা করে সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেন, 'সরকার বলছে বুকিংয়ের আড়াই দিনের মধ্যে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ করছি, দেখান কোথায় মানুষ এত দ্রুত সিলিন্ডার পাচ্ছেন।' লোকসভায় বিরোধীরা অভিযোগ করে, দেশ যখন গ্যাস সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রচারে ভোটমুখী রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও'ব্রায়েন বলেন, 'অনেক সংখ্যার মধ্যে একটি সংখ্যা খুঁজে পেয়েছি। সেটা হলো ৪২০৷ ২০১৪-র জানুয়ারিতে একটি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ছিল ৪২০ টাকা৷ এখন সেটা ৯১৪ টাকা৷'

    নজরদারি শুরু

    সিলিন্ডারের কালোবাজারি ঠেকাতে অভিযানে নামল কলকাতা পুলিশের এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ (ইবি)। শুক্রবার সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটারের অফিসে পৌঁছে যান অফিসারেরা। সিলিন্ডারের স্টক, বুকিংয়ের সংখ্যা, গ্রাহকরা ভোগান্তির মুখে পড়ছেন কি না — সব খোঁজ নেন তাঁরা। এ দিন যোধপুর পার্ক, লেক গার্ডেন্স থেকে শুরু করে কলকাতার বেশ কয়েকটি ডিস্ট্রিবিউটারের অফিসে গিয়ে কথা বলেছেন অফিসারেরা। মিলিয়ে দেখেন স্টকও। জেলাতেও পুলিশের নজরদারি শুরু হয়েছে। এ দিন চুঁচুড়া, ব্যান্ডেল, ডানলপ এলাকার কয়েকটি গ্যাসের অফিস এবং গোডাউনে অভিযানও চলে।

  • Link to this news (এই সময়)