এই সময়: ভোটের নির্ঘণ্ট এখনও ঘোষণা হয়নি। প্রার্থী তালিকাও প্রকাশ করেনি যুযুধান রাজনৈতিক দলগুলি। শহরের দেওয়ালগুলিতে এখনও ফোটেনি পদ্ম অথবা জোড়াফুল।
কিন্তু তাতে কী! শনিবার ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (PM Narendra Modi) জনসভাকে ‘মেগা পলিটিক্যাল শো’–এ পরিণত করতে চাইছে বিজেপি (BJP)। যা জোরালো ভাবে জানান দেবে— ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হোক বা না হোক, দেওয়াল লেখা শুরু হোক বা না হোক, ‘ভোট এসে গেছে’। বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ব্রিগেডে মোদীর সভার পরে সেই হাওয়া ঝড়ের চেহারা নেবে। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের অবশ্য দাবি, বিজেপি যাকে হাওয়া ভাবছে, সেই হাওয়ায় উড়ে বাংলায় তাদের পঞ্চাশটি আসনও জুটবে না।
শনিবারের ব্রিগেড কর্মসূচি খাতায়–কলমে বিজেপির নির্বাচনী জনসভা নয়। কিন্তু গেরুয়া শিবিরের নেতাদের তোড়জোড় থেকে স্পষ্ট, শনিবার ব্রিগেডের জনসভা থেকেই ভোটপ্রচার শুরু করতে চলেছেন তাঁরা। আর সে কারণেই ‘শুরু’র দিনটাকে মেগা ইভেন্ট হিসেবে ২০২৬ ভোট পর্বে স্মরণীয় করে রাখাই বঙ্গ–বিজেপির লক্ষ্য। মোদীর ভাষণ শুনতে শনিবার দুপুরে ব্রিগেডে ভিড় উপচে পড়ল কি না, সেটা সময় বলবে। কিন্তু সভার আগে ঢাক পেটানোর তীব্রতায় অন্তত কোনও খামতি রাখেননি বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। কলকাতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে শুক্রবার দুপুর থেকে দাঁড়িয়ে আছে মোদীর কাটআউট। ব্রিগেডে সভার প্রচারে শুধু কলকাতাতে এবং আশপাশে গত সাতদিন ধরে ঘুরে বেড়িয়েছে শতাধিক ট্যাবলো। সোশ্যাল মিডিয়াতেও জোরদার প্রচার চালিয়েছে বিজেপি। দলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘আমরা চাইছি, শনিবারের ব্রিগেড সমাবেশের রেশ যেন বাংলায় বিধানসভা ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকে। সভার জোশ দেখে যেন তৃণমূল নেতাদেরও চোখ কপালে ওঠে।’
বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, ‘সাংগঠনিক ভাবে শনিবার ব্রিগেডে পাঁচ লাখের জমায়েত করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। তবে আমার বিশ্বাস, সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। কারণ, ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে পরিবর্তনের ডাক শুনতে মুখিয়ে আছে বাংলার সাধারণ মানুষ।’ শুধু উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রেনে চেপে লাখের উপরে মানুষ শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জমা হবে বলে শুভেন্দুর দাবি। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘মানুষ তৈরি। এ বার বাংলায় পরিবর্তন হবেই। এটা তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির লড়াই নয়। এ বারের নির্বাচন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে রাজ্যের মানুষের লড়াই। বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই। ইয়েস তৃণমূল বনাম নো তৃণমূল–এর লড়াই। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটিতে এই প্রথমবার বিজেপির সরকার তৈরি হতে চলেছে। সেই বার্তা দিতেই প্রধানমন্ত্রী ব্রিগেডে আসছেন।’
তবে মোদীর মুখ থেকে তাঁরা ব্রিগেডে নির্দিষ্ট ভাবে কী কী শুনতে চান সেই ইঙ্গিত অবশ্য শমীক–শুভেন্দুরা বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে এসেছেন। সেখানে প্রত্যাশিত ভাবে ঠাঁই পেয়েছে অনুপ্রবেশ সমস্যা, তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলি। এর সঙ্গে রাজ্য বিজেপি নেতারা চাইছেন, ব্রিগেডের সভামঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী কিছু বড়সড় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও দিন। বিশেষত বাংলার মহিলা এবং যুব ভোটারদের কথা মাথায় রেখে মোদী কী বার্তা দেন, সে দিকেও নজর থাকছে বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্বের। যাতে ভোটের মুখে তৃণমূলের স্নায়ুচাপ কিছুটা বাড়ে। তৃণমূল অবশ্য ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর সভার আগের দিন থেকেই আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে। দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর খোঁচা, ‘বিজেপি বিলক্ষণ জানে, ব্রিগেডে তিরিশ হাজার মানুষের জমায়েত করানোর ক্ষমতাও তাদের নেই। তাই ওরা সভা করছে অর্ধেক মাঠে। সভাস্থলের বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড তৈরি করে মাঠ ছোট করা হয়েছে। তারপরেও হয়তো সভাস্থল ভরবে না।’
১ মার্চ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত বাংলার প্রতিটি জেলায় ‘পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা’ করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর থেকে এই যাত্রার উদ্বোধন করেছিলেন। ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর মেগা শো–এর মধ্যে দিয়ে যার সমাপ্তি ঘটার কথা। যদিও বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এটা সমাপ্তি নয়, বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল প্রক্রিয়ার সূচনা। আর সেই ‘সূচনা’র মূহূর্তকে ‘মেগা পলিটিক্যাল শো’–এর চেহারা দিতে সব জেলার নেতাদের টার্গেট বেধে দিয়েছেন রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। মালদা–সহ উত্তরবঙ্গের আটটি সাংগঠনিক জেলার কর্মীদের কলকাতায় মোদীর সভায় নিয়ে যেতে ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে বিজেপি। দলের কর্মীদের ‘আরামে’ নিয়ে যেতে একাধিক স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
স্লিপার ও জেনারেল কামরার ১৭ বগির এক–একটি ট্রেন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্টেশন থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা করেছেন বিজেপি নেতৃত্ব। জানা গিয়েছে, ফরাক্কা এবং মালদা টাউন স্টেশন থেকে তিনটি এবং সামসি ও হরিশ্চন্দ্রপুর স্টেশন থেকে আরও তিনটি ট্রেন শুক্রবার ছেড়েছে। সূত্রের খবর, উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ, রাধিকাপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট থেকেও পাঁচটি ট্রেন বিজেপি কর্মী সমর্থকদের নিয়ে শনিবার সকালে হাওড়া, শিয়ালদহ ও কলকাতা স্টেশনে পৌঁছবে। আসানসোল এবং বীরভূম থেকে দলী কর্মীদের ব্রিগেডে নিয়ে আসার জন্য বিজেপি আরও চারটি ট্রেন ভাড়া করেছে বলে দলীয় সূত্রে দাবি।