আশিস নন্দী, বারাসত
অতিমারীর সময়ে বারাসতের হৃদয়পুর স্টেশন (Hridoypur station in Barasat) সংলগ্ন রেল বস্তির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন এক দম্পতি। নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে। গত ৬ বছর ধরে ক্রমে বড় হয়েছে তাঁদের সংসার। এখন রেলবস্তির শিশুদের পাশাপাশি হৃদয়পুরের অসহায় বৃদ্ধ–বৃদ্ধা ও ভবঘুরেদের মুখেও খাবার তুলে দেন সৌভিক ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী সুপর্ণা। হাজার অসুবিধাতেও একদিনের জন্যও সেই কাজ বন্ধ রাখেননি হৃদয়পুরের এই দম্পতি। কিন্তু ইরানের যুদ্ধ (Iran War) পরিস্থিতিতে প্রতিদিন শতাধিক মানুষের অন্ন জোগানোর মতো জ্বালানি কোথা থেকে জোগাড় করবেন সেই চিন্তায় মাথায় হাত তাঁদের।
পেশায় ড্যান্স ও যোগা ইনস্ট্রাক্টর সুপর্ণা বলেন, ‘এখনই সব্জি ও ডিমের ঝোল দেওয়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তার বদলে ভাতের সঙ্গে নানা রকম সব্জি আর ডিম সেদ্ধর সঙ্গে পাতে একটু ঘি ছড়িয়ে দিচ্ছি। বাচ্চাদের খাবার দেওয়া বন্ধ রাখতে মন সায় দিচ্ছে না।তবে নিতান্ত অপারগ হলে শুকনো খাবার দেওয়ার কথাও ভেবে রেখেছি।’ সৌভিক বলেন, ‘রেল বস্তির ছেলেমেয়েরা দিনের বেলায় স্কুল থেকেই মিড–ডে মিল পায়। তাই রাতে একবেলার রান্না করা খাবার গত ৬ বছর ধরে ব্যবস্থা করে আসছি। কিন্তু গ্যাসের এই সঙ্কটে ওদের কী ভাবে খাবার দেব বুঝতে পারছি না।’
সৌভিক পেশায় সরকারি ঠিকাদার। মূলত সিভিল কনস্ট্রাকশনের কাজ করেন তিনি। সৌভিকের মা রত্না রায় পেশায় ফিজিয়োথেরাপিস্ট। রত্না তাঁর আয়ের পুরো টাকাটাই ছেলে–বৌমার জনকল্যাণমূলক কাজে দান করেন প্রতি মাসে। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সিলিন্ডারের আকালে অসহায় এতগুলি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কর্মকাণ্ড বজায় রাখা নিয়ে ঘোর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ঘোষ দম্পতি। বিকল্প উপায় হিসেবে কাঠের কথা ভেবে দু’পা এগোচ্ছেন, কিন্তু কাঠের জ্বালানিও মহার্ঘ হওয়ায় পিছিয়ে আসতে হচ্ছে। সৌভিক জানালেন, প্রতিদিন রান্না করা খাবারের জন্য গড়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। মাসে টাকার অঙ্কটা প্রায় ১ লক্ষ টাকা। এর সিংহভাগ টাকাই সৌভিক, তাঁর মা রত্না ও স্ত্রী সুপর্ণা দেন। তাঁদের এই সেবামূলক কাজে কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী কিছু আর্থিক সাহায্য করেন। দুটো এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারে চলে ১০ দিন। মজুত গ্যাসে আর দু’দিন রান্না করা চলবে। কিন্তু এর পর কী?
গত ৬ বছর ধরে পেটভরে খাবার পরে শিশুদের মুখে যে তৃপ্তির হাসিটুকু দেখে এসেছেন, সেটা কিছুতেই মলিন হতে দিতে চান না সৌভিক, সুপর্ণা ও রত্না। তাই, গ্যাসের সঙ্কট বজায় থাকলে চিঁড়ে–মুড়ি খাওয়ানোর কথাও বাধ্য হয়ে ভাবতে হচ্ছে তাঁদের।