• তৃণমূল বিদায়ের কাউন্টডাউন শুরু: মোদী, বদলের পরে হিসেবও হবে, স্পষ্ট বার্তা নমোর
    এই সময় | ১৫ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: বাং‍লা দখলের সম্মুখ সমর এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়নি। কিন্তু বাংলা থেকে তৃণমূল–বিদায়ের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে বলে শনিবার ব্রিগেডের সভামঞ্চ থেকে দাবি করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi) । তিনি নিশ্চিত, এ বার বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তন হচ্ছেই। তাঁর এই ‘আত্মবিশ্বাস’ বঙ্গ–বিজেপির সর্বস্তরের নেতা–কর্মীদের মধ্যেও এ দিন ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন নমো। আর সেই লক্ষ্যে তাঁর জোড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি— ‘বিকাশও হবে’ এবং ‘হিসেবও হবে’! তৃণমূলের (TMC) অবশ্য দাবি, বাংলায় যা বিকাশ করার তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই করছেন। আর হিসেবের নামে আস‍লে শান্ত বাংলায় অশান্তির উসকানি দিতে চাইছে বিজেপি।

    ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটে (2026 Assembly Elections) জিতে বাংলার মসনদ দখল করতে পারলে বিজেপি (BJP) এ রাজ্যে কী কী উন্নয়ন করবে, তার ফিরিস্তি গত একমাসে বহুবার শোনা গিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতাদের ভাষণে। এ দিন মোদীও একই সুরে ‘বিকাশ’–এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে‍ন, বাংলায় বিজেপি সরকার তৈরি হলে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প যথাযথ ভাবে রাজ্যে চালু হবে। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের কাছে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে মোদীর ‘সবার হিসেব হবে’ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি। এখানে ‘সবার’ বলতে যে তিনি তৃণমূলের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন, তা স্পষ্ট বলে মত বিজেপির নেতা–কর্মীদের। কারণ মোদীর কথাতেই, ‘বাংলায় বিজেপি সরকার তৈরির পরে আমরা সবকা সাথ সবকা বিকাশের মন্ত্রে চলব।

    অন্যদিকে, সবার হিসেবও নেব।’ ঠিক কীসের এবং কার হিসেব তিনি ‍নেওয়ার কথা বলছেন, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংযোজন, ‘তৃণমূলের গুন্ডারা আপনাদের ভয় দেখায়। বিজেপির সরকার হলে ওই গুন্ডাদের ভয়ের দিন শুরু হবে। বিজেপি সরকারের আমলে অপরাধী, অনুপ্রবেশকারী আর তোষণের রাজনীতিকরা ভয় পেতে শুরু করবে। বাংলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। অপরাধীদের ঠাঁই হবে গারদে। কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না। চুন চুনকে হিসেব নেওয়া হবে।’ এ দিনের ব্রিগেডকে মেগা শো করার পরিকল্পনা বিজেপির গোড়া থেকেই ছিল। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, অন্তত পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষের ভিড় হবে সভায়। এ দিন শেষমেশ যে ভিড় হয়েছে, তাতে খুশি পদ্ম–নেতৃত্ব। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ব্রিগেডে ভিড়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘মোদীজির কলকাতার জনসমাবেশে বিপুল ভিড় ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছে।’ তৃণমূল প্রত্যাশিত ভাবেই বিজেপির এই ভিড়ের তথ্য উড়িয়ে দিয়েছে।

    রাজনৈতিক মহলের মতে, ব্রিগেডের মেগা–শো থেকে বিধানসভা ভোটের মুখে মূলত বিজেপির নিচুতলার কর্মী–সমর্থকদের মনোবল বাড়াতে ‘হিসেব নেওয়া’র বার্তা দিয়েছেন মোদী। কারণ, বিজেপি নেতৃত্ব চাইছেন, বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল অনিবার্য, এই বিশ্বাসটা দলের কর্মী–সমর্থকদের মনে বদ্ধমূল করে ফেলতে। যে কারণে এ দিনের ব্রিগেড সমাবেশ থেকে তৃণমূল বিদায়ের দিন গোনাও শুরু করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘আমি তৃণমূলকে মনে করিয়ে দিতে চাই, তাদের গুন্ডামির দিন শেষ হতে চলেছে। তৃণমূল সরকারের যাওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে।’ বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকেও ব্রিগেড থেকে একই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে শোনা যায়, ‘তৃণমূল হারছে। তৃণমূল চলে যাচ্ছে। এ নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই।’ বাংলায় মহিলাদের নিরা‍পত্তা সুনিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, ‘এখন সন্ধ্যা হলেই মায়েরা তাঁদের মেয়েদের ফোন করে বলেন, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো। শক্তির পুজো করা বাংলা এমন অবস্থা মেনে নেবে না। মা–বোনেদের ভরসা দিচ্ছি, বিজেপি সরকারের আমলে মহিলারা সুরক্ষিত থাকবেন। অপরাধীরা জেলে থাকবে। এটা মোদীর গ্যারান্টি।’

    প্রধানমন্ত্রীর এ দিনের ‘হিসেব’ বার্তার মধ্যে অবশ্য প্রতিহিংসার রাজনীতির যাবতীয় উপাদান খুঁজে পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কথায়, ‘নরেন্দ্র মোদী ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে হিসেব নেওয়ার হুমকি দিলেন। আর তার হাতেগরম নিদর্শন আমরা গিরিশ পার্কে দেখলাম। সেখানে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে তাণ্ডব চালাল বিজেপি কর্মীরা।’ তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘মোদীজি কি সিআইএসএফ পাঠিয়ে আমাদের মারার ‍পরিকল্পনা করেছেন? তা হলে শুভকামনা রইল। উনি এখনও বাঙালিদের চিনতে পারেননি।’

    তবে বিকাশের প্রতিশ্রুতি হোক অথবা হিসেবের, মূল লক্ষ্য যে বিধানসভা ভোটের মুখে দলীয় কর্মীদের জোশ বাড়ানো সেই ইঙ্গিত এ দিন বারবার দিয়েছেন নমো। বিজেপি ক্ষমতায় আসছে— এই বিশ্বাসটাই খুব সচেতন ভাবে তিনি গেঁথে দিতে চেয়েছেন দলীয় কর্মীদের মনে। তাঁদের উদ্দেশে মোদী বলেন, ‘কিছু লোক আপনাদের ভয় দেখাতে চাইবে। বলবে, বদল সম্ভব না। মনে রাখবেন, জনতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা ইতিহাস বদলাবেই। আজ ব্রিগেডে সেই ইতিহাস আমার সামনে। এই বারের ভোট নিছক সরকার বদলের ভোট নয়। এটা বাংলার আত্মা বাঁচানোর ভোট। ব্যবস্থা বদলের ভোট। কাটমানি থেকে রেহাই পাওয়ার ভোট। ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার ভোট।’

    বিজেপি ক্ষমতায় এলে হিসেবের সঙ্গে ভরপুর বিকাশও যে হবে, সে বিষয়েও বঙ্গবাসীকে ব্রিগেডের ‘পরিবর্তন সংকল্প সভা’ থেকে আশ্বস্ত করেছেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘বাংলার বিকাশ স্বচ্ছ উদ্দেশ্যে হবে। সঠিক নীতিতে হবে। বাংলায় এখন আমাদের সরকার নেই। তবুও কেন্দ্রীয় সরকার এ রাজ্যে বিকাশ করে চলেছে। আজকেও আমি ব্রিগেডের সরকারি মঞ্চ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশির প্রকল্পের উদ্বোধন এবং শিলান্যাস করেছি।’ বাংলায় তৃণমূল সরকার কী ভাবে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, তা বর্ণনা করে নমো বলেন, ‘তৃণমূল সরকারের একটাই অ্যাজেন্ডা, নিজেরা কাজ করবে না, আমাদেরও করতে দেবে না। বাংলার নির্মম সরকার কাটমানি না পেলে সরকারি টাকা গরিব মানুষের কাছে পৌঁছতে দেবে না।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলে‍ন, ‘দেশবাসীকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দিতে পিএম সূর্যঘর যোজনা চালু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই প্রকল্পের উপভোক্তাদের বিদ্যুতের বিল শূন্য হয়ে যায়। বাংলার সরকার সেটাও লাগু হতে দিচ্ছে না। এরা বাংলার শত্রু, বাঙালির শত্রু।’ জবাবে তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদী বাংলার মানুষকে বোকা ভাবছেন। মনরেগার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রাপ্য টাকা থেকে বাংলার মানুষকে বঞ্চিত করেছে কেন্দ্র। এটা সবাই জানে।’

  • Link to this news (এই সময়)