টাকা নেই! মিলছে না সমগ্র শিক্ষা মিশনের বরাদ্দ, শৌচাগার সাফ করাতেও হিমশিম স্কুলগুলি
আনন্দবাজার | ১৫ মার্চ ২০২৬
কমছে বরাদ্দ, টান পড়ছে তহবিলে। সমগ্র শিক্ষা মিশনের টাকা না আসায় রাজ্যের একের পর এক স্কুলের পরিস্থিতি বেহাল। স্কুল চালানোই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে, অভিযোগ প্রধানশিক্ষকদের।
জানা গিয়েছে, রাজ্যের বেশির ভাগ স্কুলেই কম্পোজ়িট ফান্ড-এ যে অর্থ পাওয়া যায় তা প্রয়োজনের এক চতুর্থাংশ। তার ফলে স্কুল চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এমনকি শৌচাগার পরিষ্কার বা ভবন রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজও করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রধানশিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, একাদশ-দ্বাদশের সেমেস্টারের প্রশ্নপত্র ছাপানো, খাতা তৈরি করার পাশাপাশি খরচ হচ্ছে নানা প্রকল্পের পিডিএফ ছাপানোর কাজে। এই টাকা খরচ হচ্ছে স্কুলের নিজস্ব তহবিল থেকে।
শিক্ষমহল সূত্রের খবর, রাজ্য কেন্দ্র দড়ি টানাটানিতেই বিপাকে পড়েছে স্কুলগুলি। অভিযোগ, কেন্দ্রের তরফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সমগ্রশিক্ষার মিশনের অধীনে জেলায় জেলায় মডেল স্কুল গঠনের। সেই স্কুল তৈরি করে ‘প্রধানমন্ত্রী স্কুল’ হিসাবে চিহ্নিত করলেই বিশেষ বরাদ্দের পাশাপাশি সমগ্র শিক্ষা মিশনের টাকাও পাওয়া যেত। কিন্তু রাজ্য এই প্রকল্পে রাজি হয়নি।
সম্প্রতি এই অভিযোগ তুলেছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও। কলকাতার এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেছিলেন, যে হেতু সমগ্র শিক্ষার অধীনে এই প্রকল্প রাজ্য মেনে নেয়নি, তাই বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্পের আগে প্রধানমন্ত্রীর নাম থাকা নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকারও। কিন্তু এই দ্বন্দ্বে যে আখেরে স্কুলেরই ক্ষতি হচ্ছে, তা জানাচ্ছেন শিক্ষকদের একাংশ। কলকাতার বিটি রোড গভর্নমেন্ট স্পন্সরড হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য জানান, যে সব স্কুলে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চলে সেখানে সমস্যা সব থেকে বেশি। তাঁর স্কুলের পড়ুয়াসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।
এই সব স্কুলে শৌচাগার পরিষ্কার করা বা বিদ্যুতের খরচ টানতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। কম্পোজিট ফান্ডের টাকা থাকলে এ খরচ সহজে বহন করা সম্ভব হত বলে দাবি শিক্ষকদের। সেখানে ঘাটতি রয়েছে। তারই পাশাপাশি বা়ড়ছে খরচ। সঙ্ঘমিত্রা বলেন, “সেমেস্টারের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানো, প্রতিটি ক্লাসে সামেটিভ-ফর্মেটিভ পরীক্ষার আয়োজন করার খরচও প্রচুর। সব সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।”
শিক্ষার অধিকার আইনে প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে অবৈতনিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। সেখানে পড়ুয়াদের থেকে কোনও বেতন নেওয়া যায় না। ফলে স্কুলের উপর চাপ বা়ড়ে। কিন্তু উচ্চস্তরে আবার আর এক সমস্যা। সেখানে এক এক স্কুল এক এক রকম বেতন নিয়ে থাকে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার কৃষ্ণচন্দ্র পুর হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক চন্দন মাইতি বলেন, “প্রাক্-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক সম্পূর্ণ অবৈতনিক। সপ্তম থেকে অষ্টম পর্যন্ত পড়ুয়াদের থেকে বছরে ২৪০ টাকা নেওয়া হয়। সেটা দিয়ে খরচ চালানো অসম্ভব।”
নদিয়ার এক স্কুলের প্রধানশিক্ষক বলেন, “আমার স্কুলে প্রতিদিন শৌচাগার পরিষ্কার করার জন্য ১লিটার ফিনাইল প্রয়োজন হয়। কম্পিউটারের ইন্টারনেট খরচ, পড়ুয়াদের খাতা, প্রশ্নপত্রের খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। এ ভাবে স্কুল চালানো যায় না।”
পরিস্থিতি কলকাতার স্কুলগুলির ক্ষেত্রেও একই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধানশিক্ষক বলেন, “দৈনন্দিন খরচ ছাড়াও নানা কাজ রয়েছে। শিক্ষা দফতর, পর্ষদ বা সংসদ থেকে পিডিএফ পাঠিয়ে বলে দেওয়া হয় সেগুলি ছাপিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে বিতরণ করতে। এ জন্য টাকা কোথায় পাব?” তিনি দাবি করেন, তহবিল ফাঁকা, তার উপর অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ পরিস্থিতির কথা জানে শিক্ষা দফতর। স্কুলে ক’জন পড়ুয়া রয়েছে তার উপরে নির্ভর করে স্কুলগুলিতে অর্থ বরাদ্দ হত। কিন্তু এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না। এক কর্তা বলেন, “বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা অবহিত। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্ত।” পাশাপাশি এ-ও জানান, এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় তাঁদের জানা নেই।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল অবশ্য অভিযোগের আঙুল তুলেছেন রাজ্য সরকারের দিকে। তিনি বলেন “প্রধানমন্ত্রীর নাম থাকা অন্য প্রকল্পের অর্থ রাজ্য সরকার নিতে পারছে। পিএম স্কুল মেনে নিলে সমস্যা কোথায়? আসলে রাজ্যের বুনিয়াদি শিক্ষাকেই সমূলে নষ্ট করে দিতে চাইছে সরকার।”