শ্যামগোপাল রায়
গ্যাস এজেন্সির যে 'ডেলিভারি দাদারা' এতদিন ফোন করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্যাসের সিলিন্ডার (LPG CYLINDER) দিয়ে যেত, তারা হাত তুলে নিয়েছে। কেউ সিলিন্ডার দেবো বললেও দাম চাইছে ডাবল। কারণ, চাহিদার তুলনায় সিলিন্ডারের জোগান কম। এই পরিস্থিতিতে দমদম, বেলঘরিয়া থেকে যাদবপুর, শিয়ালদহ, শ্যামবাজার চত্বরে মেসে থাকা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের জেলার পড়ুয়ারা পড়েছেন মহা ফাঁপরে।
শহরের মেসগুলোয় সাধারণত চার-পাঁচ জন পড়ুয়া যৌথ ভাবে রান্নার ব্যবস্থা করেন। মেস কালচারের অন্যতম অঙ্গ এই 'এক থালায় খাওয়া'। কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে অধিকাংশেরই নিজস্ব গ্যাস কানেকশন নেই। এতদিন পাড়ার ডিলার বা চেনা 'ডেলিভারি দাদারা' বাড়তি কিছু টাকার বিনিময়ে সিলিন্ডার পৌঁছে দিতেন মেসে। কিন্তু এখন ভরসার সেই চেনা হাতগুলোও উঠে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী বুকিংয়ের অন্তত ২৫ দিন পরে মিলবে গ্যাস— ফলে ডেলিভারি কর্মীদের পক্ষেও বাড়তি সিলিন্ডার 'ম্যানেজ' করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দমদমের একটি মেসে থেকে পিএসসি-র প্রস্তুতি নিচ্ছেন বোলপুরের বাসিন্দা অর্কপ্রভ চৌধুরী। তাঁর কথায়, 'হোটেলে একবেলা খেতে গেলে ১০০ টাকার কমে কিছু হয় না। মেসে চার জন মিলে রান্না করলে খরচ অর্ধেক। কিন্তু এখন গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বিগুণ দাম দিয়ে গ্যাস কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই। সেই কারণে বাড়ি চলে যাওয়া ছাড়া আর উপায় দেখছি না।'
একই সুর যাদবপুরের মেসে থাকা ছাত্রী অন্তরা চৌধুরীর গলাতেও। তাঁর কথায়, 'বাজারে যা সিলিন্ডারের দাম, এতদিন তার থেকে ১০০ টাকা বেশি নিত ডেলিভারির দাদারা। কিন্তু এখন ওরা বলছে গ্যাসের জোগান নেই। নিতে হলে দ্বিগুণ দাম িদতে হবে।' এমনিতেই মাসের শেষে মেসের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। গ্যাসের জন্য বাড়তি টাকা কোথা আসবে? এ ভাবে চললে পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি গিয়ে বসে থাকতে হবে— সাফ কথা অন্তরার। মেস মালিকদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ। দমদমের এক মেস মালিক দেবব্রত চৌধুরীর আক্ষেপ, 'আমার বাড়ির একতলায় পুরুলিয়ার ৫টা ছেলে থাকে। রান্না করেই খায়। কিন্তু, গ্যাস শেষ হওয়ায় শুক্রবার দু'জন বাড়ি চলে গেছে। কারণ, হোটেল গিয়ে রোজ খাবে এমন আর্থিক ক্ষমতা অনেকেরই নেই। অনেক চেষ্টা করেও ওরা গ্যাস পায়নি।' মেসে থাকা পড়ুয়াদের বক্তব্য, পড়াশোনা, কলেজ যাতায়াত–সহ অন্য খরচের পর খাবারের পিছনে এত বাড়তি খরচ বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।
দমদম চত্বরে গ্যাস ডেলিভারি করা এক কর্মীর কথায়, 'আমাদের হাতে মাল নেই। ওপর থেকে জোগান না থাকলে আমরা কী করব? বুকিং করার অনেকদিন পরে সিলিন্ডার আসছে। তাই খারাপ লাগলেও মেসের ছেলেদের বাধ্য হয়েই না বলতে হচ্ছে।' গ্যাসের এই সঙ্কট কবে কাটবে, সেই অপেক্ষাতেই এখন প্রহর গুনছেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কলকাতায় পড়তে আসা অসংখ্য পড়ুয়া।