আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল রাজ্যে দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন, গণনা ৪ মে
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৬ মার্চ ২০২৬
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, ভোট প্রক্রিয়ার লক্ষ্য একমাত্র অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। সব বুথে একশো শতাংশ ওয়েব কাস্টিং করা হবে। ১৭ সি ধারা অনুযায়ী ভোটের শতকরা হার দেখা যাবে। প্রতি দফায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর প্রতি দুই ঘন্টা অন্তর ভোটগ্রহণের হার প্রকাশ করা হবে। পোস্টাল ব্যালট গণনা ইভিএমের দুই রাউন্ডের গণনার আগে হবে। গণনার পর পরাজিত প্রার্থী ভিভিপ্যাট পরীক্ষা করতে পারবেন। কোনওরকম ফেক নিউজ বা অপপ্রচারের ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, সংবেদনশীল বুথে বিশেষ নজরদারি এবং ভোটকেন্দ্রে ন্যূনতম পরিকাঠামো নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং প্রয়োজন হলে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাও রাখা হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটের দিন ভোটারদের পরিচয়পত্র হিসেবে এপিক কার্ড ছাড়াও আধার, পাসপোর্ট, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ মোট ১২ ধরনের নথি গ্রহণযোগ্য হবে। ভোটের আগে প্রত্যেক ভোটারের বাড়িতে ভোটার স্লিপ পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ, প্রচার এবং জোট রাজনীতি ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ আরও চড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
প্রথম দফার গেজেট নোটিফিকেশন ৩০ মার্চ এবং দ্বিতীয় দফার জন্য ২ এপ্রিল জারি করা হবে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ প্রথম দফায় ৬ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফায় ৯ এপ্রিল। মনোনয়ন যাচাই প্রথম দফায় ৯ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফায় ১০ এপ্রিল। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখ প্রথম দফায় ৯ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফায় ১৩ এপ্রিল।
রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৬৮টি তফশিলি জাতি এবং ১৬টি কেন্দ্র তফশিলি উপজাতি সংরক্ষিত। এই মুহূর্তে রাজ্যের ভোটার তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৫ লক্ষ ৬১ হাজার ১৫২জন থাকলেও তালিকা অনুসারে সাধারণ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ ৫২ হাজার ৬৯০ জন। পরে আরও সাপ্লিমেন্টারি তালিকা যুক্ত হবে। বর্তমান তালিকায় থাকা মোট ভোটারদের মধ্যে ৮৫ বছরের উর্ধে ভোটারের সংখ্যা রয়েছে ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার ৯৭৯জন। এছাড়া ৪ লক্ষ ১৬ হাজার ৮৯ জন প্রতিবন্ধী এবং ১১৫২জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ২২৯ জন নতুন ভোটার।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের সময় রাজ্যে মোট ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৮০হাজার ৫৩০টি। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮০,৭১৯টি। বর্তমানে রাজ্যে মোট ভোট কর্মীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৮ হাজার ৫৪৩ জন।
আগামী ২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় মোট ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম দফায় সমগ্র উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির ভোটগ্রহণ হয়ে যাবে। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলার পাশাপাশি প্রথম দফায় জঙ্গলমহলেও নির্বাচন রয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদে প্রথম দফায় নির্বাচন। পূর্ব এবং পশ্চিম মেদিনীপুরেও প্রথম দফায় ভোট। আবার দুই বর্ধমানে দুই দফাতেই ভোটগ্রহণ করা হবে। প্রথম দফায় পশ্চিম বর্ধমানে ভোট রয়েছে।
দ্বিতীয় দফার নির্বাচন আগামী ২৯ এপ্রিল, বুধবার। ওই দিন কলকাতা-সহ পূর্ব বর্ধমান, নদিয়া, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভোটগ্রহণ করা হবে।
প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুতেই নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ রাজ্যে এসে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে অন্যান্য দল এক বা দুই দফার ভোটের পক্ষে আবেদন করেছিল। কমিশন মূলত বিরোধী দলের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, ‘সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এবার দুই দফায় নির্বাচন করা প্রয়োজন। তাহলে ভোট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতা মুক্ত হবে।’ বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমার আরও জানান, ২০২১ সালের নির্বাচনের পর ভোট পরবর্তী সহিংসতায় অভিযুক্ত বা সক্রিয় না থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ইতিমধ্যেই কমিশন চেয়েছে। সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ভোটের তারিখ ঘোষণার ঠিক আগে রাজ্য সরকার পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা বৃদ্ধি করেছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। দিল্লির বিজ্ঞান ভবনের সাংবাদিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ‘মডেল কোড অব কন্ডাক্ট ভোটের তারিখ ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে। তার আগে যে কোনও সরকারি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে এখন থেকে মডেল কোড অব কন্ডাক্ট কার্যকর।’
উল্লেখ্য, আগামী ৭ মে রাজ্য বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় এখনও বহু বৈধ ভোটারের নাম তালিকায় ওঠেনি। এখনও রাজ্যের প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার বিবেচনাধীন রয়েছেন। এমতাবস্থায় ভোটারদের তালিকা চূড়ান্ত না হওয়া অবধি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যবাসীর একটি বৃহৎ অংশের আপত্তি সত্ত্বেও অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা নিয়েই ভোট প্রক্রিয়া শুরু করতে চলেছে নির্বাচন কমিশন।