• নির্বাচন ঘোষণা হলেও বাংলার 'বিচারাধীন' ভোটারদের কী হবে? তাকিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে
    এই সময় | ১৬ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: পশ্চিমবঙ্গ সমেত দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার লিস্টে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) (SIR) ঘোষণা হয়েছিল ২৭ অক্টোবর। তার মধ্যে চার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল— পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির বিধানসভা নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি রবিবার ঘোষণা করল দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর এক ভোটমুখী রাজ্য অসমে অবশ্য 'সার' হয়নি, সেখানে স্পেশাল রিভিশন চালিয়েছে কমিশন। কিন্তু নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশের দিনেও ব্যতিক্রমী বাংলা। কারণ, বাকি ১২টি রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে 'সার'–এর পরে ২০২৫–এর তালিকা থেকে ভোটারদের একাংশের নাম বাদ পড়েছে, নতুন করে নাম সংযোজিতও হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষিত হয়ে গেলেও একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের নাম রয়েছে 'আন্ডার অ্যাজুডিকেশন' ('Under adjudication') বা 'বিচারাধীন' তালিকায়।

    ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে গেলেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই 'বিচারাধীন' লিস্টে ঝুলে থাকা ভোটারদের কী হবে? তাঁদের মধ্যে কতজন এ বার বিধানসভা ভোটে ভোটাধিকার পাবেন এবং 'অ্যাজুডিকেশনে'র পুরো কাজ ভোটের আগে শেষ হবে কি না। রবিবার কমিশন সূত্রের খবর, ৬০ লক্ষের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষের মতো 'বিচারাধীন' ভোটারের নথির নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে যাঁদের নথি স্ক্রুটিনিতে 'পাশ' করেছে, তাঁদের সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট চলতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হবে।

    এই প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষের মতো ভোটারের মধ্যে কতজন 'পাশ' এবং কতজন 'ফেল' করলেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও কমিশন প্রকাশ করেনি। তবে সূত্রের দাবি, এই নিষ্পত্তি হওয়া 'অ্যাজুডিকেশন' ভোটারদের মধ্যে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি 'ফেল' করেছেন। অর্থাৎ, তাঁদের নথিতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি জুডিশিয়াল অফিসার বা বিচারকরা। বাকিরা 'পাশ' করেছেন। তাঁদের নাম সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে থাকবে। বাকিদের ভাগ্য ঝুলে থাকবে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের কাছে। কারণ, গত সপ্তাহে বাংলার 'সার' মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দিয়েছে, প্রাক্তন বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের। তারাই এই 'ফেল' করা ভোটারদের বিষয়টি চূড়ান্ত ভাবে নিষ্পত্তি করবেন। কিন্তু সেই ট্রাইব্যুনাল কবে গঠিত হবে, গত সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বৈঠকের পরেও চূড়ান্ত হয়নি। ফলে যাঁরা বাদ পড়বেন, তাঁরা বিধানসভা ভোটের আগে ভোটাধিকার পাবেন, এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন অনেকে।

    যদিও এ দিন দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার বলেন, 'সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আন্ডার অ্যাজুডিকেশন ভোটারদের নথির নিষ্পত্তি যেমন যেমন এগোবে, সেই মতো সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে।' কিন্তু এই পুরো কাজটা ভোটের মধ্যে সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত কোনও মন্তব্য করেননি তিনি। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে 'সার' শুরু হয়েছিল, সেই তালিকায় থাকা বড় রাজ্যগুলির মধ্যে উত্তরপ্রদেশে 'সার'–এর চূড়ান্ত লিস্ট এখ‍নও প্রকাশিত হয়নি। বাকিদের মধ্যে শতাংশের নিরিখে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে নরেন্দ্র মোদী–অমিত শাহের রাজ্য গুজরাটে, প্রায় ১৩.৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম বাম–শাসিত কেরলমে ৩.৩৩ শতাংশ। বিজেপি শাসিত আরও তিন বড় রাজ্য মধ্যপ্রদেশে ৭.৫, ছত্তিসগড়ে ১১.৭৭ এবং রাজস্থানে ৫.৭৪ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তৃণমূলের বন্ধু দল ডিএমকে শাসিত তামিলনাড়ুতে বাদ গিয়েছেন ১১.৫ শতাংশ ভোটার।

    ভোটমুখী কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে বাদ গিয়েছে ৭.৫ শতাংশ ভোটারের নাম। আর অসমে স্পেশাল রিভিশনে (এসআর) বাদ পড়েছেন প্রায় ৫ শতাংশ ভোটার। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে ২০২৫–এর লিস্ট থেকে এখনও পর্যন্ত ৮ শতাংশের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। ২০২৫–এর ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ থেকে এই মুহূর্তে ভোটার তালিকার চূড়ান্ত লিস্ট অনুযায়ী বাংলায় ভোটার সংখ্যা কমে ৬ কোটি ৪৪ লক্ষে নেমে এসেছে (এর মধ্যে আন্ডার অ্যাজুডিকেশন ধরা নেই)। কিন্তু এ ভাবে ৬০ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য বিচারকদের হাতে ঝুলে রয়েছে— এমনটা অন্য কোনও রাজ্যেই হয়নি। এই ভোটারদের মধ্যে কত শতাংশ শেষমেশ ভোটাধিকার পাবেন তার উপরেই সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট নির্ভর করছে।

    নিয়ম অনুযায়ী, যে কোনও দফায় ভোটের মনোনয়ন পেশের শেষ দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম থাকবে, তাঁরা সেই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। সেই হিসেবে এখনও ৬০ লক্ষের মধ্যে বাকি 'আন্ডার অ্যাজুডিকেশন' ভোটারদের নথির নিষ্পত্তি কোন‍ও ভাবে শেষ হলেও অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল ঘুরে 'ফেল' করা ভোটারদের পক্ষে ভোট দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের পাশাপাশি কমিশনের কর্তারাও। বাংলায় দু'দফায় ভোটের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন যথাক্রমে ৬ ও ৯ এপ্রিল। অর্থাৎ সেই হিসেবে হাতে রয়েছে তিন সপ্তাহের মতো। তার মধ্যে বাকি প্রায় ৪৪ লক্ষ 'বিচারাধীন' ভোটারদের নথির নিষ্পত্তি হবে কি না এবং যাঁরা ট্রাইব্যুনালে যাবেন, তাঁদের নথির চূড়ান্ত ফয়সালা হবে কি না, সে নিয়ে চিন্তায় কমিশনও। আগামী ২৫ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে বাংলার 'সার' মামলার পরবর্তী শুনানি আছে। এর আগের শুনানিতে শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল, ভোটের আগের দিন পর্যন্ত বৈধ ভোটারের নাম তালিকায় তোলা যাবে। তবে 'অ্যাজুডিকেশন' এবং ট্রাইব্যুনালে আবেদনের বিষয়টি ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরে খতিয়ে দেখা হবে। ফলে এখন সুপ্রিম কোর্ট কী করবে, সে দিকেও নজর সব পক্ষের।

  • Link to this news (এই সময়)