প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
দ্বারকেশ্বর নদের (Dwarkeswar River) অববাহিকায় এক ক্রোশ জুড়ে এই পুরাক্ষেত্রের বিস্তৃতি ছিল বলেই এই প্রত্নক্ষেত্রের নাম ক্রোশজুড়ি। আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে। এই শিব মন্দিরে (Shiva Temple) যিনি সিদ্ধেশ্বর নামে পূজিত, তিনি এক ক্রোশ জুড়ে ঘুরে বেড়ান বলেই নাম ক্রোশজুড়ি।
পুরুলিয়ার কাশীপুর থানা এলাকার এই প্রত্নক্ষেত্রের নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের (West Bengal State Archaeology Department) প্রাক্তন বিশেষজ্ঞ দেবকুমার চক্রবর্তী এটি অষ্টম শতাব্দীর বলে মনে করেন। মন্দির বিশেষজ্ঞ ডেভিড ম্যাককাচন মনে করেন, এই নির্মাণ হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে। রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আর এক প্রাক্তন বিশেষজ্ঞ পরেশ দাশগুপ্ত মনে করেন, এই প্রত্নস্থল গুপ্তযুগের (পঞ্চম শতাব্দী)।
গবেষকদের মতে, ব্রিটিশ ইতিহাস গবেষক জেডি বেগলার ১৮৭২–এ নিজে ঘুরে ঘুরে পূর্ব ভারতের মন্দিরগুলির ক্ষেত্র সমীক্ষা করেছিলেন। তাঁর বই ‘এ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’-এ সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেই বইয়ে ক্রোশজুড়ি প্রত্নস্থল সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই প্রত্নস্থল কার্যত অনালোকিত ছিল। মনে করা হয়, সিদ্ধেশ্বর ধাম নামক ক্রোশজুড়ির যে মূলমন্দির, সেটি মাটি চাপা অবস্থায় থাকায় বিশেষজ্ঞরা সে সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। নিমাইলাল সেনাপতি নামে এলাকার এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে খনন শুরু হওয়ায় সামনে আসে এই প্রত্নস্থল। ১৯৬৪–৬৫–তে রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের নজরে আসে এই মন্দিরটি। ১৯৭১–এ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই মন্দিরকে স্টেট প্রোটেক্টেড মনুমেন্টের স্বীকৃতি দেয়।
ক্রোশজুড়ি প্রত্নস্থলে এখনও পর্যন্ত সিদ্ধেশ্বর মন্দির, দেউলটাঁড়ের বিষ্ণু বা অবলোকিতেশ্বর মন্দির, কাজলকুড়া পুষ্করিণীপাড়ের শিবমন্দির, শিবটাঁড়ের পাথর নির্মিত এবং ইট নির্মিত, মোট এই পাঁচটি মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। জেলার গবেষক সুভাষচন্দ্র মোদকের মতে, ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এই মন্দিরক্ষেত্রের মূলমন্দির হলো সিদ্ধেশ্বরের মন্দির, যাকে ঈশান দেবতার মন্দিরও বলা হয়। এর গঠনশৈলী মহাবলীপূরমের রথমন্দির বা মধ্যপ্রদেশের চন্ডেলা রাজাদের রেখদেউলের মতই। ওডিশি ভাবও দেখা যায়। যদিও এই স্থাপত্যের অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবুও রথমন্দিরের অবয়ব আজও স্পষ্ট। খনন চালিয়ে যে সমস্ত মূর্তি, প্রত্নবস্তু বা বীরস্তম্ভ মিলেছে, মন্দিরক্ষেত্রেই তা পড়ে বা বিভিন্ন জায়গায় রাখা আছে।
গর্ভগৃহে দশটি গৌরিপট–সহ কালো কষ্টিপাথরের বিশাল শিবলিঙ্গ রয়েছে। নিপুণ ও নিখুঁত সামঞ্জস্য রেখে খোদাই করা এই শিবলিঙ্গের উচ্চতা সাড়ে তিন ফুট। গবেষকরা মনে করেন, মন্দিরটির উচ্চতা অনেক বেশি ছিল। অনেকেরই আক্ষেপ, রাজ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই মন্দিরকে স্টেট প্রোটেক্টেড মনুমেন্টের স্বীকৃতি দিলেও সে ভাবে সংস্কার হয়নি। জেলা পরিষদের কো–মেন্টর সহদেব মাহাতো বলেন, ‘প্রাচীন এই মন্দিরের নীচের অংশ অর্থাৎ কাঠামোর কিছু অংশ অক্ষত অবস্থায় আছে। তার গঠনশৈলী দেখে যাতে এই মন্দিরক্ষেত্রের সংস্কার হয়, তা নিয়ে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।’