দিগন্ত মান্না কোলাঘাট
‘কুবের হাঁকিয়া বলে, যদু হে এ এ এ— মাছ কিবা? খানিক দূরের নৌকা হইতে জবাব আসে, জবর। জবাবের পর সে-নৌকা হইতে পালটা প্রশ্ন করা হয়। কুবের হাঁকিয়া জানায় তাদেরও মাছ পড়িতেছে জবর। ধনঞ্জয় বলে, সাঁঝের দরটা জিগা দেখি কুবের ...।’
এ ভাবেই শুরু হয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (Manik Banerjee's 'Padmanadir Majhi')। তবে, কুবেররা মাছ ধরছিল ইলিশের (Hilsa) ভরা মরশুমে। এ বঙ্গে বর্ষা আসতে এখনও ঢের দেরি আছে। তার আগেই কপাল খুলে গিয়েছে কোলাঘাটের (Kolaghat) রূপনারায়ণের মৎস্যজীবীদের। সম্প্রতি রূপনারায়ণে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বেশ বড় আকারের ইলিশের ঝাঁক। এক একটি জেলে নৌকায় গড়ে আট থেকে দশ কেজি ইলিশ ধরা পড়ছে। বাজারে সে ইলিশ বিক্রিও হচ্ছে কেজি প্রতি ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকায়। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের দাবি, রূপনারায়ণের নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় কয়েক দশক ধরে নদে সে ভাবে ইলিশের দেখা মেলেনি। সম্প্রতি রূপনারায়ণে ড্রেজিংয়ের কারণেই ইলিশ মিলছে।
স্বাদের জন্য এক সময়ে কোলাঘাটের ইলিশের সুনাম ছিল জগৎজোড়া। শোনা যায়, পরাধীন ভারতে বহু ভারতীয় ইংরেজদের কোলাঘাটের ইলিশ ভেট দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিতেন। তবে গত বেশ কয়েক বছরে নদের নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ আর ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহারের ফলে কোলাঘাটের ইলিশের দেখা মিলছিল না। বিপাকে পড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকেছিলেন বহু মৎস্যজীবী।
ইলিশ মূলত গভীর জলের মাছ। বর্ষায় এরা ডিম পাড়তে আসে মিষ্টি জলে। ইলিশের প্রিয় খাদ্য রটিফার নামে এক ধরনের জ়ু–প্ল্যাঙ্কটন। যা রূপনারায়ণে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। এর টানে আগে সমুদ্র থেকে রূপনারায়ণে ইলিশের ঝাঁক ঢুকত। গেঁওখালি থেকে ঘাটাল পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার রূপনারায়ণ নদের অংশ ছিল ইলিশের পছন্দের জায়গা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোলাঘাট বাজার এলাকায় রূপনারায়ণে ৫০০ মিটারের মধ্যে সড়ক ও রেল মিলিয়ে মাথা তুলেছে মোট পাঁচটি সেতু। মোট পিলারের সংখ্যা ৪২ টি। বিশালাকার সেতুতে স্রোত ধাক্কা খেয়ে রূপনারায়ণে ক্রমশ পলি জমে যায়। এর ফলে তৈরি হয় বিশাল চর।
বছর দুয়েক আগে কোলাঘাটের দেনানে কেন্দ্রীয় পরিবহণ মন্ত্রকের অধীন ভারতীয় অন্তর্দেশীয় জলপথ কর্তৃপক্ষ একটি জেটি তৈরির ব্যাপারে উদ্যোগী হন। সেই কারণে নদের বেশ কয়েক কিলোমিটার অংশ ড্রেজিং করা হয়। সম্প্রতি সেচ দপ্তরের উদ্যোগেও কোলাঘাটে রূপনারায়ণ নদ সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। নদের নাব্যতা বেড়ে যাওয়ায় রূপনারায়ণে ইলিশের দেখা মিলছে। শ্রীমন্ত দাস নামে এক ইলিশ ব্যবসায়ী বলছেন, ‘আমার নিজের নৌকো রয়েছে। প্রতি দিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ কেজি ইলিশ ধরা পড়ছে। এক একটি ইলিশের ওজন এক কেজি থেকে ১২০০ গ্রাম ওজনের।’ কোলাঘাটের বাসিন্দা অসীম দাসের কথায়, ‘এখন রূপনারায়ণে রোজ জালে ইলিশ উঠছে। আমরা খুব খুশি।’ পূর্ব মেদিনীপুরের প্রাক্তন মৎস্য আধিকারিক সুরজিৎ বাগ জানাচ্ছেন, রূপনারায়ণে প্রচুর জ়ু–প্ল্যাঙ্কটন ও ফাইটো প্ল্যাঙ্কটন রয়েছে। তার টানেই ইলিশের ঝাঁক নদে থেকে গিয়েছিল। সেগুলোই এখন ধরা পড়ছে। ড্রেজিংয়ের ফলে নদের নাব্যতা বেড়ে যাওয়া ইলিশ–লাভের অন্যতম বড় কারণ।