বাংলার ৬ 'যুদ্ধক্ষেত্র', খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে ছাব্বিশের ভোটে
আজ তক | ১৬ মার্চ ২০২৬
শনিবারেই পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে ২ দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল ভোট হবে ১৫২ কেন্দ্রে। দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল ভোট হবে ১৪২টি কেন্দ্রে। মনে করা হচ্ছে, ভোট ঘোষণার পর সোমবার থেকেই তেড়েফুড়ে প্রচারে নেমে পড়তে পারে রাজনৈতিক দলগুলি। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের মূল লড়াই হতে চলেছে মূলত ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল ও প্রধান বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে। ২৯৪টি আসন ঠিক করে দেবে আগামী পাঁচ বছর বঙ্গ থাকবে কার দখলে। তবে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গে এমন ৬টি ব্যাটেলফিল্ড রয়েছে, যে জায়গাগুলিই আদপে ঠিক করে দেবে বাংলার মসনদে কে বসবে? সেগুলি কোনগুলি- দেখে নেওয়া যাক।
১. জঙ্গলমহল: বাংলায় বিজেপি রাজনীতির লঞ্চপ্যাড
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলিতে ভোটের দ্বন্দ চরমে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে এই এলাকায় বিজেপি হিন্দুত্ব এবং আদিবাসী পরিচয়ের রাজনীতির মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস 'দুয়ারে সরকার' এর মতো কল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। ঐতিহাসিকভাবে এই এলাকাকে বিজেপির 'বাংলার প্রবেশদ্বার' হিসেবে মনে করা হয়। এই আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলটি ২০১৯ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির জন্য ইতিবাচক জনসমর্থন দিয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এই অঞ্চলে যথেষ্ট ভালো পারফর্ম করেছিল। রাজ্য স্তরে তৃণমূল তার আধিপত্য বজায় রাখলেও, বিজেপি বেশ কয়েকটি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় নিজেদের শেকড় গেঁড়েছে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
২. শিল্প-কৃষি জোন
মেদিনীপুর, হুগলি, হাওড়া, ব্যারাকপুর , ঘাটাল, ঝাড়গ্রাম এবং দুর্গাপুরের মতো এলাকাগুলি শিল্প ও কৃষি উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। বেকারত্ব, কারখানা বন্ধ এবং কৃষকদের সমস্যা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, এই অঞ্চলের অনেক আসনে সামান্য ব্যবধানে তৃণমূল জিতে নিয়েছিল। এই এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস মূলত শ্রমিক ইউনিয়ন এবং কৃষক প্রকল্পের সমর্থনের উপর নির্ভর করে। অন্যদিকে বিজেপি কারখানা বন্ধ এবং যুব বেকারত্বের উপর ভোটারদের ক্ষোভকে পুঁজি করার চেষ্টা করে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে, এই এলাকাগুলির অনেক আসন ৫,০০০ এরও কম ভোটের ব্যবধানে TMC জয়ী হয়েছে। ২০২১ সালের ফলাফল হুগলি, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং পশ্চিম বর্ধমানের খনিজ সমৃদ্ধ এলাকায় অত্যন্ত কাছাকাছি ছিল। ২০১৬ সালের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এই জেলাগুলির একাধিক এলাকায় বিজেপি ২০২১-এ বেশি ভোট পেয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই এলাকার দখল রয়ে গিয়েছে TMC-র হাতেই।
৩. কলকাতা দুর্গ
এই এলাকায় বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারেনি। কলকাতা ও শহরতলি এলাকাকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনও সন্দেহ নেই যে এই এলাকা এখনও পুরোপুরি তৃণমূলের দখলেই রয়েছে। শহর দুর্গ শাসকদলের হাতে থাকলেও, মধ্যবিত্তদের অসন্তোষ, কর্মসংস্থান এবং দুর্নীতির বিষয়গুলি উত্থাপন করে বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্ককে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাপক দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির বিষয়টি তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্ককেও প্রভাবিত করতে পারে।
৪. সীমান্ত এলাকা: নাগরিকত্ব আইন এবং মতুয়া ভোট ব্যাঙ্ক
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা যেমন নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনায় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০-৪০টি আসনে প্রভাব রয়েছে। বিজেপি নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের মাধ্যমে সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বাঙালি পরিচয়, এনআরসি-বিরোধী প্রচার এবং কল্যাণমূলক প্রকল্পের উপর জোর দিচ্ছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে, মতুয়া-অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র রয়েছে। যে দল মতুয়া সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে নিজেদের দিকে টানতে পারবে, ভোটের ফলাফল তাঁদের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে।
৫. সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকা:তৃতীয় শক্তির উত্থান নিয়ে প্রশ্ন
মুর্শিদাবাদের মতো জেলা এতদিন ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের নিশ্ছিদ্র ঘাঁটি। কিন্তু প্রাক্তন তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীর নিজের দল ঘোষণা করতেই যাবতীয় হিসেব উল্টে যেতে বসেছে। হুমায়ুন নিজে মুর্শিদাবাদের দখল নিতে পারে। বাবরি মসজিদ নিয়েও প্রচার ব্যাপক প্রচার হতে পারে। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদ-মালদার মতো জেলায় বাম-কংগ্রেসও কয়েক দশক ধরে শক্তিশালী রয়েছে। যদি এই বাম ও কংগ্রেস এই জেলাগুলিতে নিজেদের আসনের সামান্যও ফেরত পায়, সেক্ষেত্রে চাপে পড়তে পারে তৃণমূল। অন্যদিকে ভোট কাটাকুটির অঙ্কে কয়েকটি আসন জিততে পারে পদ্ম শিবিরও।
৬. উত্তরবঙ্গ: বিজেপির শক্তি ঘাঁটি
এমনিতেই উত্তরবঙ্গ বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে বিজেপি এখানে শক্তিশালী। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের শুরু থেকেই উত্তরবঙ্গকে টার্গেট করেছে তৃণমূলও। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের দলও জানে, উত্তরবঙ্গে বিজেপিকে ধাক্কা দিতে পারলে তা মোট আসনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গে গোর্খাল্যান্ড, চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি এবং রাজবংশী পরিচয়ের মতো বিষয়গুলি নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।