• বিরোধিতা নয়, ভাতা-নির্ভরতাও নয়, ভোটের আগে বার্তা বামের
    আনন্দবাজার | ১৬ মার্চ ২০২৬
  • ভাতা দেওয়ার বিরোধিতা নয়। কিন্তু শুধু ভোটের বাক্সে লাভের জন্য অনুদানের রাজনীতির বদলে সাধারণ অর্থনীতির উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি সহায়তা। বিধানসভা ভোটের ইস্তাহারে আর্থিক অনুদানের প্রশ্নে এ বার দলের অবস্থান স্পষ্ট করে দিতে চলেছে সিপিএম।

    রাজ্যে দু’দফায় ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। সব ঠিক থাকলে আজ, সোমবারই বামফ্রন্টের প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা এবং এক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্য স্তরের ইস্তাহার প্রকাশ করে দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। পুরনো প্রথা ভেঙে এ বার রাজ্য স্তরের পাশাপাশি জেলা ও যেখানে সম্ভব, সেখানে বিধানসভা এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট আরও ইস্তাহার তৈরি করবে সিপিএম। মহিলা বা যুব অংশের সরকারি ভাতা পাওয়ার বিরোধী যে বামেরা নয়, এই বার্তা ভোটের আগে পরিষ্কার করে দিতে চান সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব।

    পাঁচ বছর আগে বিধানসভা ভোটে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ জয়ের পরে সিপিএম তাদের নির্বাচনী পর্যালোচনা রিপোর্টে বলেছিল, রাজ্য সরকারের সে বার চালু করা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ মহিলাদের তো বটেই, সাধারণ পরিবারের উপরেই বড় প্রভাব ফেলেছে। যার মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। ভোটের আগে ওই ভাতা সম্পর্কে নানা স্তরের নেতাদের তির্যক মন্তব্য যে জনমানসে বিরূপ ধারণা তৈরি করেছিল, তা-ও মেনে নিয়েছিলেন বাম নেতৃত্ব। এ বার তাই আগে থেকেই সতর্কতা। তৃণমূলের সরকার যেমন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে ১৫০০ টাকা (জনজাতি মহিলাদের জন্য ১৭০০ টাকা) দিচ্ছে, বিজেপি আবার তাদের ‘সঙ্কল্প পত্রে’ পাল্টা প্রতিশ্রুতি দিতে চলেছে সরকারে এলে ‘অন্নপূর্ণার ভান্ডার’ করে মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার। অনুদান বা খয়রাতির রাজনীতিতে শাসক দল স্বাভাবিক ভাবেই সুবিধা পায় সরকারে থাকার কারণে, বিরোধীদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করণীয় থাকে না। সিপিএম যখন শূন্যের গেরো ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করছে, বিজেপি ও তৃণমূলের সঙ্গে প্রতিশ্রুতির টক্করে যাওয়ারও অবকাশ তাদের ক্ষীণ। কিন্তু তাদের সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা যাতে থেকে না যায়, বামেদের মূল লক্ষ্য সেটাই।

    বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে বেকার ভাতা চালু করেছিল এক সময়ে। প্রথমে ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করে পরে অঙ্ক বাড়ানো হয়েছিল। চাকরির জন্য যাঁরা এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লেখাতেন, সেই তরুণ-তরুণীরা কাজ পাওয়ার আগে পর্যন্ত ভাতা-র জন্য বিবেচিত হতেন। চাকরি পেয়ে গেলে সেই তালিকা থেকে নাম বাদ যেত। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘যুব-সাথী’ প্রকল্প ঘোষণা করেছেন ভোটের আগে। কিন্তু এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নেই। ছাত্রদের বৃত্তি বা সরকারি অন্য কোনও অনুদান না-পেলে ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে যে কেউই ‘যুব-সাথী’র টাকা পেতে পারেন। এই তফাত দেখিয়েই সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য নগদ সহায়তা একটা স্বীকৃত ধাপ। কিন্তু এখানে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারে’ ৫০০ টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে ২০২১ সালে, সেটা ১০০০ টাকা করা হয়েছে ২০২৪ সালে আর এখন ২০২৬-এ এসে ১৫০০ টাকা। প্রত্যেকটাই ভোটের বছর! বাজেটে বলা হল, ‘যুব-সাথী’ অগস্টে হবে। পরে সেটা এপ্রিল বলে আবার মার্চ থেকেই দেওয়ার ঘোষণা হল। বোঝাই যাচ্ছে, যুবদের সহায়তার চেয়ে ‘ক্যাশ ফর ভোট’-এর তাগিদই এখানে প্রবল!’’ তাঁর দাবি, ‘‘তৃণমূল বা বিজেপি ভোটের জন্য ভাতা দিচ্ছে, আমরা মানুষের অধিকার ও উন্নতির কথা বলছি।’’

    কোভিডের সময়ে দলের তরফে যে প্রান্তিক মানুষের জন্য মাসিক সহায়তার দাবি তোলা হয়েছিল, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে সিপিএম। পাশাপাশিই, ইস্তাহারে বলা হচ্ছে, নানা রকম অনুদানে সাধারণ, গরিব মানুষের অবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন হয়ে থাকলে জেলায় জেলায়, গ্রামে ভুঁইফোঁড় ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার জাল আবার ছড়াত না। সমবায়ের মাধ্যমে নিম্নবিত্ত অংশের সাহায্যও এখন কার্যত অমিল। ভাতা-র বিনিময়ে সরকারের ঘরে ভোট গেলেও মানুষের ঘরে সমস্যা যে অনেক, সে কথাই বোঝাতে চাইছেন বাম নেতৃত্ব।

    সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিম বুঝিয়ে দিয়েছেন, মহিলাদের সহায়তা দেওয়া বন্ধের কথা তাঁরা কখনওই বলছেন না। তবে মহিলাদের ভাতা-নির্ভরের বদলে স্বনির্ভর করা ও তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার দিকে নজর থাকবে। তিনি বলেছেন, ‘‘বামপন্থীরা ক্ষমতায় এলে এর চেয়ে বেশি টাকা দিতে পারবে। কারণ, দুর্নীতিতে টাকা নয়ছয় হবে না। আমরা মানুষের অধিকার বোধ তৈরি করতে চাই। আয় বাড়ানোয় নজর দিতে হবে।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)