• সোনারপুর দক্ষিণে ‘লাভলি ফ্যাক্টর’-এই ফের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বদলাবে প্রার্থী?
    আনন্দবাজার | ১৬ মার্চ ২০২৬
  • পাঁচ বছর আগে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চমক দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই কেন্দ্রে সিরিয়ালের তরুণী অভিনেত্রী অরুন্ধতী মৈত্র ওরফে লাভলিকে প্রার্থী করে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পরিবেশ কার্যত সমূলে উপড়ে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। একাধারে নতুন মুখ এবং অন্য দিকে ‘অরাজনৈতিক’ ভাবমূর্তির জোরে সেই সিদ্ধান্তই তখন ‘মাস্টারস্ট্রোক’ প্রমাণিতহয়েছিল। প্রায় ২৭ হাজার ভোটে জিতে সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের পতাকা উড়িয়েছিলেন লাভলি।

    কিন্তু পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই ছবিটাই বদলে গিয়েছে বলে দাবি দলের অন্দরের। তৃণমূলের স্থানীয় ও শীর্ষ মহলের একাংশেরঅভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর ‘মানসকন্যা’ বলে পরিচিত লাভলির হাত ধরেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর কান পর্যন্ত গিয়েছে বলে দলের একটি সূত্রের দাবি।

    সম্প্রতি এসআইআর নিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে ধর্না মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দেখা গিয়েছিল লাভলিকে। তবে, সেই মঞ্চেই নাকি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— সোনারপুর দক্ষিণে লাভলিকে আর প্রার্থী করা হবে না। যদিও ঘনিষ্ঠ মহলে মুখ্যমন্ত্রীর ইঙ্গিত, অন্য কোনও কেন্দ্রে তাঁকে প্রার্থী করা হতে পারে।

    দলের অন্দরের খবর, লাভলির কার্যকলাপ নিয়ে ক্ষোভ জমেছে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৮টি ওয়ার্ড ও ছ’টি পঞ্চায়েত এলাকায় দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর মধ্যে। সূত্রের খবর,পরিস্থিতি দেখে বিচলিত তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থার প্রতিনিধিরাও। তাঁদের মতে, “সোনারপুর দক্ষিণে পরিস্থিতি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, প্রার্থী না বদলালে বিধানসভা নির্বাচনে বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এমনকি, কেন্দ্রটি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”

    ওই কেন্দ্রে ভোটের পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল ২৭ হাজারেরও বেশি, সেখানে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ফল বিশ্লেষণেদেখা যাচ্ছে, এক ধাক্কায় সেই ব্যবধান নেমে এসেছে প্রায় ৯–১০ হাজারে। বিগত পাঁচ বছরে লাভলির জনপ্রিয়তা হারানোর প্রভাব এই পরিসংখ্যানে ধরা পড়ছে বলে মততৃণমূলের পরামর্শদাতা ভোটকুশলী সংস্থার।

    সোনারপুর দক্ষিণ নিয়ে শাসকদলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন বলে দলের অন্দরের খবর। সূত্রের দাবি, অভিষেক ইতিমধ্যেই রাজ্যসভারএক প্রাক্তন সদস্যকে এই কেন্দ্রে প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। যদিও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি ওই নেতা।

    সোনারপুর দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে লাভলির বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাদের একাংশের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতি পাওয়ার পর থেকেই লাভলির আচরণে এসেছে ঔদ্ধত্য। সর্বত্রনীল আলো লাগানো গাড়ি ও পুলিশি পাহারায় ঘোরাফেরা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে ‘আমরা-ওরা’ পরিস্থতি তৈরি করা এবং একটি নিজস্ব বলয় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, সেই বলয়ের সঙ্গেইজড়িয়ে পড়েছে একাধিক দুর্নীতির প্রসঙ্গও। পুরপ্রতিনিধি ও পঞ্চায়েত প্রধানদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগওউঠেছে। ফলে এলাকায় ক্রমশ বাড়ছে ক্ষোভ।

    তবে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন অরুন্ধতী মৈত্র। তাঁর দাবি, ধর্না মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীরসঙ্গে তাঁর নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও আলোচনা হয়নি। লাভলি বলেন, “বিধায়ক হিসেবে প্রশাসন ও পঞ্চায়েতের কাজকর্মের খোঁজ রাখা আমার দায়িত্ব। তাতে কেউ বিরক্ত হলে আমার কিছু করার নেই। আমার কোনও নির্দিষ্ট বলয় নেই। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনেই কাজ করি।”

    পুলিশি পাহারা নিয়ে সব সময়ে ঘোরার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। লাভলির কথায়, “আমি প্রায়ই স্কুটি চালিয়ে এলাকায় ঘুরি। আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ভাবে চক্রান্ত করা হচ্ছে। সব বিষয়ই মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব।”
  • Link to this news (আনন্দবাজার)