• লুপ্তপ্রায় আলতাপেটি, টিকিয়াপরী, কুমড়োজালি ভুলেছে ‘আমজনতা’
    বর্তমান | ১৬ মার্চ ২০২৬
  • সৌম্য দে সরকার,মালদহ: কমলা দিয়ে যেমন দার্জিলিং, আপেল দিয়ে কাশ্মীরকে চেনা যায়, আম সেই পরিচয় দিয়েছে মালদহকে।

    আমকে ঘিরে জেলার অর্থনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আবেগ তৈরি হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। মালদহে উৎপাদিত যেসব আমের প্রজাতিকে সারা ভারত চেনে তার অধিকাংশই বিলুপ্ত প্রায়। হারিয়ে যাওয়া কিংবা বিপন্ন হতে বসা এমন সব প্রজাতির আম নিয়ে আলোচনায় স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েন মালদহের প্রকৃত আমপ্রেমীরা। সম্প্রতি এমন সব লুপ্তপ্রায় প্রজাতির আমের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে সকলের অলক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন মালদহের কিছু বাসিন্দা, সংগঠন। আসরে নেমেছে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের দু’টি দপ্তরও।

    মালদহের আম নিয়ে কথা উঠলেই মুখে মুখে ঘোরে কিছু জনপ্রিয় অথচ নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রসঙ্গ। মালদহের গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি (হিমসাগর), লক্ষ্মণভোগ, ন্যাংড়া, আম্রপালি, মল্লিকা এবং অবশ্যই ফজলি দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সমাদৃত। এর সঙ্গে কাঁচামিঠা, গুটি আমের কদরও যথেষ্ট।

    কিন্তু এর বাইরে মালদহের আমের শব্দকোষ বা ডিকশনারিতে রয়েছে এমন সব আম, যেগুলির নামই ভুলে গিয়েছে জেলার ‘আম-জনতা’।

    মালদহ ম্যাঙ্গো মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক এবং বংশ পরম্পরায় সম্পন্ন আমচাষি উজ্জ্বল চৌধুরী বিভিন্ন অজানা আম প্রজাতির ঝাঁপি খুলে ধরেন ‘বর্তমান’ এর সামনে। বলেন, দুধকোমল, মেঘলাল, আলতাপেটি, উলট কোমল, টিকিয়াপরী, বাতাসা, জিলিপিগাড়া, কুমার খা, দমকা, গঙ্গা প্রসাদ, ফুনিয়া, কুমড়োজালি, দিলখোস, কুয়াপাহাড়, কলাগুটি, শীষাবাড়ি গুটি, আশুদাগি সহ প্রায় ১৭০ প্রজাতির আম মালদহের নিজস্ব। এই সমস্ত প্রজাতির আমের বেশিরভাগ আজ আর ফলে না। যে কয়েকটি বিপন্ন হয়েও টিকে রয়েছে, সেগুলির উৎপাদনও নামমাত্র বললেই চলে।

    তাঁর দাবি, চার দশক আগেও মালদহের এমন সব নিজস্ব আম মিলত যথেষ্ট। জেলার কিছু আম তো বিখ্যাত আলফান্‌সো প্রজাতিকেও টেক্কা দিতে পারত অনায়াসে।

    হরিশ্চন্দ্রপুরে কিছু কুমার খা আমের গাছ আজও রয়েছে। পুখুরিয়া এলাকায় রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি আশুদাগি আমের গাছ। টিকিয়াপরী এবং কুমড়োজালি আমের আমসত্ব খাওয়ালে চিরশত্রুও মিত্র হয়ে যাবে, হাসতে হাসতে দাবি এই প্রবীণ আম উৎপাদকের।

    মালদহের এক আম উৎপাদক তথা ইংলিশবাজার পুরসভার কাউন্সিলার সুজিতকুমার সাহার কথায়, অনেক প্রজাতির আম বিলুপ্ত প্রায় হয়ে যাওয়ার কারণ বাজারে পরিচিতি কম হওয়ায় দাম সেভাবে মেলে না। পাশাপাশি ফলনও কম। রাজ্য, দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাও নামমাত্র। এছাড়া পরিচিত আমগুলি দেখতেও সুন্দর। তাই আমচাষিরা বাণিজ্যিক বিষয়টি বিবেচনা করে জনপ্রিয় আমের প্রজাতির দিকেই ঝোঁকেন।

    হারিয়ে যাওয়া ও বিলুপ্ত প্রায় আমগুলির পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করছে কেন্দ্রীয় সরকারের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সংস্থার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সাব ট্রপিক্যাল হর্টিকালচার (আইআইএসএইচ) এবং রাজ্য সরকারের উদ্যানপালন বিভাগ।

    আইআইএসএইচের মালদহ আঞ্চলিক স্টেশনের মুখ্য বিজ্ঞানী দীপক নায়ক জানান, বউ ভোলানি, রসগোল্লা, চিন্তামণি, সারদাভোগ, মাসুমা, মেহেবুবা, রাখালভোগ সহ প্রায় ২৫০ প্রজাতির আম উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে মালদহের। স্থানীয় পরিভাষায় এই আমগুলি ‘খাউকি’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ বিপণন নয়, নিজেদের খাওয়ার জন্যই এই আমগুলির উৎপাদন হত। বহুদিন এসব আম উধাও। বিপুল পরিমাণ আমের জমি বাণিজ্যিক প্লট হিসাবে বিক্রি সহ নানা কারণে এই প্রজাতিগুলি প্রায় বিপন্ন। তাই জেলা উদ্যানপালন আধিকারিকের সঙ্গে যৌথভাবে ১৫০টি লুপ্তপ্রায় প্রজাতির আমকে বেছে নেওয়া হয়েছে পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে। উদ্ভিদ প্রজাতি ও কৃষক অধিকার সুরক্ষা আইনের (২০০১) আওতায় ৪০টি প্রজাতির আমকে এনে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। আরো কিছু প্রজাতিকেও এর আওতায় আনা হচ্ছে।

    এছাড়া, ‘অ্যাপেডা’র সহায়তায় বাহরিনে মালদহের লুপ্তপ্রায় প্রজাতির কিছু আম আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিতির জন্য হাজির করা হয়েছিল। জেলার হারিয়ে যেতে বসা আমকে ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
  • Link to this news (বর্তমান)