• হিংসামুক্ত ভোট করাতে ২৫০০ কোম্পানি ফোর্স, দুই দফা নির্বাচনের জন্য সম পরিমাণ বাহিনীর ব্যবহার
    এই সময় | ১৭ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: ভোট–হিংসা রুখতে জোড়া দাওয়াই! একদিকে রেকর্ড সংখ্যক বাহিনী দিয়ে এ বার বাংলায় ভোট করাতে চলেছে দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অন্য দিকে, সাম্প্রতিক অতীতে ভোট ও ভোট পরবর্তী হিংসার রেকর্ড যেখানে রয়েছে, সেখানকার অফিসারদের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাজ্য পুলিশের কর্তাদের, যাতে হিংসাপ্রবণ এলাকার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদেরও কার্যত ‘নজরবন্দি’ রাখা যায়। শুধু তাই নয়, এ বার কোনও বুথে গোলমাল হলে শুধু রাজ্য পুলিশ বা প্রশাসন নয়, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপরেও দায় বর্তাবে। এমনকী কোথাও গোলমালের খবর পেয়ে বাহিনী সময়ে পৌঁছচ্ছে কি না, সেটাও নজর রাখা হবে। সোমবার রাজ্যের বিশেষ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত স্পষ্ট বলেছেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট করতে সবরকম চেষ্টা করছি। ভোটকে কেন্দ্র করে অশান্তি–হিংসার যে কালচার, এ বার তাতে বদল আসবে বলে মনে করি।’

    ২০০১ থেকে ২০২১— গত দু’দশকের তুলনায় বাংলায় এ বারের বিধানসভা ভোটে রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে চলেছে দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, দু’দফায় মোট ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটের জন্য প্রায় আড়াই হাজার কোম্পানি বাহিনী আসতে চলেছে এ বার। ২০০১–এর বিধানসভা ভোট হয়েছিল এক দফায়। তারপরে যত দিন গড়িয়েছে, ততই বাংলায় বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের দফা বাড়তে বাড়তে গিয়েছে। এ বার যে হেতু দু’দফায় ভোট হচ্ছে, তাই কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যাও অনেকখানি বাড়তে চলেছে। প্রথম দফায় ১৫২টি ও দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটের জন্য সম পরিমাণ বাহিনীই ব্যবহার করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।

    এ বার কমিশন গোড়া থেকেই বলে এসেছে, হিংসা–সন্ত্রাস–রক্তপাতহীন ভোট করাতে তারা বদ্ধপরিকর। তার জন্য শুধুমাত্র পর্যাপ্ত সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নয়, অতীতের ভোটে যেখানে হিংসা বা ভোট পরবর্তী হিংসা হয়েছে, সেখানে বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে এ বার। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬,৫০০ বুথকে স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত সপ্তাহে কমিশনের ফুলবেঞ্চ রাজ্যে এসে জানিয়ে দিয়েছি‍ল, অতীতে যে সব জায়গায় ভোটে হিংসার অভিযোগ উঠেছে, সেখানকার থানার ওসি এবং সুপারভাইজ়িং অফিসারদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত রাজ্যকে জানাতে হবে। রবিবারই পশ্চিমবঙ্গ–সহ পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে কমিশন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কমিশনের তরফে রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক রাজ্য পুলিশের এডিজিকে (লিগ্যাল) একটি চিঠি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২১–এর বিধানসভা ও ২০২৪–এর লোকসভা নির্বাচন পর্বে ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী হিংসা যেখানে যেখানে হয়েছে, সেই সব থানার অফিসারদের তালিকা সোমবার সন্ধে ৬টার মধ্যে পাঠাতে হবে ইসি–র কাছে। এর আগে কমিশনের ফুলবেঞ্চ রাজ্যে এসে পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের বৈঠকে সতর্ক করে দিয়েছিল, ভোট মিটে গেলেই কমিশনের এক্তিয়ার শেষ হয়ে যাচ্ছে ভেবে কোনও অফিসার যদি নিশ্চিন্ত থাকেন, তা হলে তিনি ভুল ভাবছেন। কারণ, কোনওরকম হিংসা হলে ভোট মিটে গেলেও সংশ্লিষ্ট অফিসারকে চিহ্নিত করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে।

    এ দিন সকালেই রাজ্যের ৩০ জন ডব্লিউবিসিএস (এগ‌জ়িকিউটিভ) আধিকারিকের বদলির বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানা যায়। ওই বিজ্ঞপ্তিটি ১৩ মার্চ, শুক্রবার জারি করা হলেও তা প্রকাশ্যে আসে, সোমবার। বিজ্ঞপ্তিতে একাধিক জেলায় অতিরিক্ত জেলাশাসক (এডিএম) পদে নতুন নিয়োগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনে সম্প্রতি যে সব বদলি হয়েছে, তার উপরে বাড়তি নজর রাখছে কমিশন। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর রাজ্যে কোন কোন পুলিশ আধিকারিককে বদলি করা হয়েছে, সেই তালিকা বদলি-নির্দেশিকার প্রতিলিপি-সহ কমিশনের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। অবসরের পরে কোনও পুলিশ আধিকারিককে বর্তমানে কোনও পদ দেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও জানাতে বলা হয়েছে। এই রিপোর্ট সময়মতোই পাঠানো হয়েছে বলেই নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।

    এ বার বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বেনজির ভাবে অনেকটা আগেই কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হয়েছে রাজ্যে। ইতিমধ্যে দু’দফায় ৪৮০ কোম্পানি বাহিনী এসেও গিয়েছে। তাদের বিভিন্ন জেলায় ভাগ করে টহলদারি ও ভোটারদের মধ্যে কনফিডেন্স বিল্ডিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও যেখানে অশান্তির ইতিবৃত্ত আছে, সেখানে সঠিক ভাবে বাহিনীকে না–নিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় বাহিনীকে ঘোরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এ বার কড়া নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। ভোটের আগে এবং ভোটের দিন বাহিনীর মুভমেন্টের উপরে কন্ট্রোলরুম খুলে নজরদারি চালানো হবে। নজর রাখা হবে ওয়েবক্যাম ও জওয়ানদের বডিক্যাম মারফতও। কমিশন সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত কোনও ভোটকেন্দ্রে একটি বুথ হ‍লে সেখানে হাফ সেকশন অর্থাৎ চার জন এবং একটি ভোটকেন্দ্রে দু’টি বুথ থাকলে সেখানে এক সেকশন অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বাহিনীর আট জন জওয়ানকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা মাথায় রেখে ফোর্স অ্যালোকেশনের পরিকল্পনা চলছে। বুথের সংখ্যা বাড়লে সেই অনুযায়ী জওয়ান‍ের সংখ্যা বদলাবে। কোন জেলায় কত বাহিনী মোতায়েন হবে, তা নিয়ে খুব শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে কমিশন।

  • Link to this news (এই সময়)