অমিত চক্রবর্তী
কেউ ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছেন, কেউ বা ঘুরেফিরে খাচ্ছেন ডাব। কারও ঠোঁটে সকাল থেকেই সিগারেট। কেউ আবার টেনশন কমাতে খেলেন ওষুধ। কেউ চায়ের কাপ হাতে টানা পায়চারি করে যাচ্ছেন। তবে ঘুরেফিরে সবার চোখই মোবাইলে। কোনও বার্তা এল কি? চাপ সামলাতে না পেরে অনেকে ফোনও করছেন— কোনও খবর আছে?
উপরের কোনও চরিত্রই কাল্পনিক নয়। এই সব চরিত্রের সোমবার বিকেলের ঠিকানা ১৪ কিড স্ট্রিটের এমএলএ হস্টেল। সেখানেই বিভিন্ন ঘরে, বারান্দায় ইতিউতি চোখে পড়ল জটলা। বিধায়ক হওয়ার পরে জেলা থেকে কলকাতায় এলে নিয়মিত অনেকেই ওঠেন কিড স্ট্রিটের এই এমএলএ হস্টেলে। নিজেদের এলাকায় সেই সব হেভিওয়েটদের এখন দেখলে মনে হতেই পারে যেন মাধ্যমিকের রেজ়াল্ট বেরোনোর দিনের কোনও পরীক্ষার্থী। সকলের মনেই একটা প্রশ্ন— শেষ পর্যন্ত শিকে ছিঁড়বে তো? কোটি টাকার এই প্রশ্নের জবাব পেতে সিটিং এমএলএদের এখন আশা–আশঙ্কার দোলাচলে দিন কাটছে।
এঁদের অনেকেই বিধায়ক হওয়ার পরে নিজেদের নম্বর বদলে ফেলেছিলেন। অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে ধরেন না বলেও অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধে। অথচ এখন সেই বিধায়করাই অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে সঙ্গে সঙ্গে ধরছেন। কারণ? সেই অচেনা নম্বর থেকেই যদি আসে সেই অমোঘ বার্তা— আপনি নথি রেডি করুন বা এমন কিছু।
এক বিধায়ক কথায় কথায় তাঁর এক সঙ্গীকে জানালেন, মহিলাঘটিত বিষয়ে জেলায় দলের এক বিধায়কের আসন বদলাচ্ছে বলে খবর। তাতে পাতা কাটতে পারে যে কারও। ফলে এই বিধায়ক যথেষ্টই উদ্বেগে রয়েছেন। আবার পুরুলিয়ার একটি বিধানসভায় এক তরুণী নেত্রীকে প্রোমোট করা হচ্ছে বলে দলের অন্দরেই ইতিউতি শোনা যাচ্ছে। যা কানে গিয়েছে ওই কেন্দ্রের সিটিং এমএলএের। সেই বিধায়ক এখন তা নিয়ে বাপবাপান্ত শুরু করেছেন। কারণ তিনি নাকি জানতে পেরেছেন এক ব্যবসায়ী ওই তরুণীর হয়ে লবি করছেন।
এই সব জল্পনা, গুঞ্জনের মাঝেই খানিক বাদে বামফ্রন্টের প্রার্থীতালিকা বের হলো। বামেদের যে হেতু এখন কোনও বিধায়কই নেই, তাই এমএলএ হস্টেলে সেই প্রার্থীতালিকা নিয়ে কোনও হেলদোল চোখে পড়ল না। কিন্তু এর পরে বিজেপির ১৪৪ জনের তালিকা প্রকাশ হতেই যেন বদলে গেল ছবিটা। যাঁদের নাম উঠেছে, তাঁদের মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। গত কয়েক দিনের চাপ কাটতেই এই বিধায়করা চেনা মেজাজে। কেউ ছুটলেন পার্টি অফিস, কেউ বা কুলদেবতাকে পুজো দিতে। টিকিট পাননি এমন বিধায়কের মুখে ততক্ষণে আঁধার নেমে এসেছে।
এরই মধ্যে কেউ কালীঘাটে নিজের কোনও সোর্সকে চুপি চুপি বাজিয়ে দেখছেন, কেউ আবার দিল্লির অফিসের কোনও চতুর্থ শ্রেণির কর্মীকে ফোন ঘোরাচ্ছেন। এ সবের মধ্যেই এক বিধায়ককে দেখা গেল, নিজের কেন্দ্রে এক কর্মীকে ফোন করে বেদম চেঁচাচ্ছেন। জানা গেল, টেন্ডার বের হওয়ার পরে কাজ শেষ হয়ে গেলেও সরকারি প্রকল্পের নাম লেখা বোর্ড এখনও বসেনি। ভেতরে ভেতরে টেনশন রয়েছে বলেই হয়তো বা চিৎকারটা একটু বেশি করে ফেললেন।
এ সবের মধ্যেই আলিপুরদুয়ারের এক বিধায়কের দার্শনিক মন্তব্য, ‘টিকিট না দিলে কী আর হবে! জীবন তো কাড়বে না।’