এই সময়: রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করল নবান্ন।
সোমবার সন্ধ্যায় সামনে আসা এই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) ২০০৮-এর এপ্রিল থেকে নয়, আপাতত দেওয়া হবে ২০১৬–র জানুয়ারি থেকে ২০১৯-র ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই বকেয়া মেটানো হবে দু’কিস্তিতে। প্রথম কিস্তির টাকা মিলবে ৩১ মার্চের মধ্যে। পরের কিস্তির টাকা দেওয়া হবে সেপ্টেম্বরে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট, গ্রুপ ডি পদে কর্মরত ছাড়া বাকি কর্মরত সরকারি কর্মীরা আপাতত বকেয়া ডিএ–র টাকা হাতে পাবেন না। তাঁদের ডিএ–র টাকা পৌঁছে যাবে জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ডে (জিপিএফ)। এই টাকা তাঁরা তুলতে পারবেন দু’বছর পরে। তবে পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর রয়েছে। বকেয়া ডিএ–এর প্রথম কিস্তির টাকা এ মাসের শেষেই তাঁদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।
সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী, বিধিবদ্ধ সংস্থা, সরকারি আন্ডারটেকিং, পঞ্চায়েত, পুরসভা, স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার মতো অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের ২০০৮–এর এপ্রিল থেকে ২০১৯–এর ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়া মহার্ঘ ভাতার পরিমাণ কতটা, তা জানাতে হবে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে। তার পরে ঠিক হবে, এই সব সংস্থায় কাজ করা কর্মচারীরা কী ভাবে বকেয়া ডিএ পাবেন।
রবিবার নির্বাচনী আদর্শ আচরণ বিধি জারি হওয়ার ৫৫ মিনিট আগে, দুপুর ৩টে ৫ মিনিট নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, বকেয়া ডিএ–র টাকা মিটিয়ে দেবে রাজ্য সরকার। তবে কী ভাবে এই টাকা দেওয়া হবে, কারা এই টাকা পাবেন, তা নিয়ে বেশ কিছু ধোঁয়াশা ছিল। সোমবার অর্থ দপ্তরের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি সামনে আসার পরেই সেই ধোঁয়াশা কাটল।
ধোঁয়াশা কাটলেও বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন ডিএ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলনরতরা এবং সরকারি কর্মচারীদের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, ২০০৮–এর এপ্রিল থেকে কেন বকেয়া ডিএ মেটানো হচ্ছে না? এ নিয়ে অর্থ দপ্তরের বাখ্যা, ওই সময় থেকে এখনও পর্যন্ত কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের তথ্য এই মুহূর্তে রাজ্যের হাতে নেই। রাজ্য সরকার ২০১৬–এর জানুয়ারি থেকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এইচআরএমএস) পোর্টাল চালু করেছে। ফলে ২০১৬ থেকে সরকারি কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত সব তথ্য পোর্টালে রয়েছে। তাই এই সময়কালের ডিএ–র হিসেব করা রাজ্যের পক্ষে সহজ। তাই এই সিদ্ধান্ত। সরকারি অফিসারদের দাবি, ২০০৮–র পর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সরকারি অফিসার ও কর্মীদের সব তথ্য নেই সরকারের কাছে। এই তথ্য এজি বেঙ্গল (জিপিএফের নোডাল সংস্থা) থেকে সংগ্রহ করতে হবে। এর জন্য সময় লাগবে।
মামলাকারী সরকারি কর্মচারী কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ়-এর সভাপতি শ্যামল মিত্র ও সাধারণ সম্পাদক মলয় মুখোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট ডিএ–র পক্ষে রায় দিয়েছে। এর আগে গত বছর শীর্ষ কোর্ট বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তা হলে সরকার কেন সরকারি কর্মচারীদের সব তথ্য আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখেনি?’ সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, জিপিএফে নয়, সরাসরি এই বকেয়া টাকা সরকারি কর্মীদের হাতে তুলে দিতে হবে। তবে সরকার কর্মরতদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানছে না। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আদালত অবমাননা বলেই মনে করছেন মলয়। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথাও ভাবছেন তাঁরা। অর্থ দপ্তর অবশ্য বিজ্ঞপ্তিতে বকেয়া ডিএ মেটানো সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্তের জন্য রাজ্যের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও কেন্দ্রীয় সরকারকেই দায়ী করেছে। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বকেয়া টাকা রাজ্য পাচ্ছে না। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নমূলক কাজের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে রাজ্যের। তাই ডিএ নিয়ে এই সিদ্ধান্ত।
সরকারি বজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গ্রুপ এ, বি, এবং সি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ তাঁদের জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (জিপিএফ) অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। গ্রুপ ডি কর্মচারীদের বকেয়া সরাসরি জমা পড়বে তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। জিপিএফ অ্যাকাউন্টে বকেয়া টাকা জমা পড়ার পর দু’বছর তোলা যাবে না। ওই সময়ের মধ্যে কোনও কর্মচারী অবসর নিলে, পদত্যাগ করলে অথবা মারা গেলে তোলা যাবে ওই টাকা। পেনশন প্রাপকদের বকয়া ডিএ–র প্রথম কিস্তির টাকা সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। ফ্যামিলি পেনশনভোগীরাও একই সুবিধা পাবেন। কলকাতার বাইরে যাঁরা ট্রেজ়ারি থেকে পেনশন নেন, তাঁদের টাকা সংশ্লিষ্ট ট্রেজ়ারিতে চলে যাবে। কলকাতায় যাঁরা ব্যাঙ্কের মাধ্যমে পেনশন নেন, তাঁরা অ্যাকাউন্টেই এই টাকা পাবেন। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কিছু সময় চাকরি করেছেন, এমন যাঁরা এখন পদত্যাগ করেছেন তাঁরাও নির্দিষ্ট চাকরির সময়ের বকেয়া ডিএ পাবেন। কোনও সরকারি কর্মচারী মারা গিয়ে থাকলে তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারী বকেয়া ডিএ পাবেন।