নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ‘গরিবের ট্যাক্সি’ অটো রিকশ’র জ্বালানির ক্ষেত্রেও তুমুল সংকট তৈরি করেছে। লিকুইড পেট্রলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তুমুল সংকটের জেরে শহর কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলি, বিধাননগর এবং হাওড়া ও হুগলি জেলার একের পর এক রুটে চাকা গড়াচ্ছে না অটো রিকশ’র। সংকট পর্বেই প্রতি কেজি এলপিজির দাম ৫৭.৬৮ থেকে বেড়ে ৬২.৬৮ টাকা হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও এলপিজি জোগাড় করে যে সমস্ত রুটে অটো এখনও চলছে, তাতেও সারাদিন গাড়ি নামাতে পারছেন না বহু চালকই। ফলে একের পর এক রুটে অটো বস যাচ্ছে। বহু জায়গায় আবার আচমকাই বৃদ্ধি হয়েছে ভাড়া। একে অটোর স্বল্পতা, তার উপরে ভাড়া বৃদ্ধি সবমিলিয়ে যাত্রী দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। পুলিশ ও পরিবহণ দপ্তরের নজরদারি যেখানে কম, সেখানে এলপিজি’র বদলে বেআইনিভাবে ‘কাটা গ্যাস’ (রান্নার জন্য ব্যবহৃত সিলিন্ডার) দিয়ে অটো রিকশ চালানো হয়। পাম্পগুলিতে এলপিজি সংকটের জেরে শহর ও শহরতলির বেশ কিছু অংশে ফের কাটা গ্যাসের রমরমা কারবারও শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই পর্বেই আবার ডবল সিলিন্ডারের অনেক গ্রাহক চড়া দামে অটো রিকশ চালকদের কাছে অব্যবহৃত সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। বনগাঁ থেকে এ ধরনের বেশ কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে।
জ্বালানি সংকটের জেরে শহর ও শহরতলির যে সমস্ত রুটের অটো রিকশ’র সংখ্যা কমছে, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন ইউনিয়নের কাছ থেকে মেলা পরিসংখ্যান হল, উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসত থেকে বারাকপুর পর্যন্ত রুটে চলত ১০০টি অটো। এখন চলছে মাত্র ৩০টি। টাকি রোডে চলাচল করত ১১৬টি অটো রিকশ, এখন চলছে ৮০টি। যশোর রোডের বিভিন্ন রুটে চলত মোট ৪৫০টি, সেখানে বন্ধ হয়ে গিয়েছে ২৮০টি অটো রিকশ। বারাকপুর শহর ঘিরে বিভিন্ন রুটে দৈনিক ১২০০ অটো চলাচল করে। জ্বালানি সংকটে ৫০ শতাংশের বেশি অটো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অভিযোগ, এখানে সুযোগ পেলেই বেশি ভাড়া নিচ্ছেন চালকরা। বারাকপুর-ডানলপ রুটে ভাড়া ছিল ৪০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৫০ হয়েছে। এই রুটের মাঝপথে নামলে, নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে আরও পাঁচ টাকা করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। তবে সবই হচ্ছে মৌখিকভাবে। অটো রিকশ ইউনিয়ন ভাড়া বাড়ানোর কথা স্বীকার করছে না।
সীমান্ত শহর বনগাঁয় প্রায় ২৫০ অটো রিকশ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখানে এলপিজি গ্যাসের পাম্প না থাকায় ‘কাটা গ্যাস’এর রমরমা কারবার চলত। সেই কারবার এখন বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা। সেই সুযোগে এক শ্রেণীর এলপিজি গ্রাহক তাঁর ডবল সিলিন্ডারের একটি ১৫০০-১৬০০ টাকায় অটো চালকদের বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মহেশতলা ও বজবজ মিলিয়ে প্রায় ২৫০০ অটো রিকশ নিয়োজিত ছিল যাত্রী পরিবহণে। তার মধ্যে ৫০০’র মতো অটোর চাকা বন্ধ হয়ে রয়েছে। উল্টোডাঙা-কাঁকুরগাছি, উল্টোডাঙা-ফুলবাগান এবং হাডকো মোড় থেকে করুনাময়ীর মতো সাত-আটটি রুটে সবমিলিয়ে ৪০০টি অটো চলাচল করত। সব রুটেই ২০-২৫টি অটো রিকশ কম চলছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিধাননগরে এই মুহূর্তে ভাড়া না বাড়লেও, প্রায় ৫০ শতাংশ অটো বন্ধ রয়েছে। করুণাময়ীর ডিরোজিও ভবন থেকে চার নম্বর ট্যাঙ্ক পর্যন্ত রুটে ৭২টি অটো চলাচল করত, তার মধ্যে বন্ধ হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টি।
কল্যাণী শহরের পাঁচটি রুট। প্রায় ২৫০টি অটো রয়েছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ অটো বন্ধ রয়েছে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার কারণে। হুগলির চুঁচুড়া, বাঁশবেড়িয়া, মগরা, সিঙ্গুর, হরিপাল ও উত্তরপাড়ায় জ্বালানি সংকটের জেরে অর্ধেকের বেশি অটো বসে গিয়েছে। ত্রিবেণী-চুঁচুড়া রুটের নিত্যযাত্রী অজিত দাস বলেন, ‘আগে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করলেই অটো মিলত। এখন একটা চলে গেলে, পরেরটা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।’ এর মধ্যেই হাওড়ায় গ্যাসের স্টক আজকের মধ্যেই প্রায় শেষ হয়ে যাবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।