• কর্মীদের আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে বাদ মনোজ তিওয়ারি
    এই সময় | ১৮ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়, বালি: গত বিধানসভা ভোটে তিনি ছিলেন হাওড়া শহরের অন্যতম তারকা প্রার্থী। হাওড়ার শিবপুর কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রত্যাশা মতোই তাঁকে রাজ্য মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখনও তিনি খাতায় কলমে রাজ্য ক্রীড়া দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী। সক্রিয় রাজনীতি না করলেও হাওড়ার শিবপুর এলাকায় তাঁর যথেষ্ট দাপট রয়েছে। অথচ, তাঁকেই এ বার প্রার্থী করেনি তৃণমূল! তা নিয়ে তাঁর অনুগামীরা অখুশি হলেও তৃণমূলের নিচুতলার নেতা–কর্মীদের অনেকেই উচ্ছ্বসিত। শিবপুর কেন্দ্রে মনোজ তিওয়ারিকে সরিয়ে প্রার্থী করা হয়েছে বালির বিধায়ক তথা পেশায় চিকিৎসক রানা চট্টোপাধ্যায়কে। রানার জায়গায় বালি থেকে লড়বেন দলের যুব নেতা কৈলাশ মিশ্র।

    রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, স্থানীয় নেতা–কর্মীদের আবেগকে মর্যাদা দিয়েই এ বার ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারিকে প্রার্থী করা হয়নি। বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। শিবপুরের মতো হাওড়ার পুরোনো বর্ধিষ্ণু এলাকায় মনোজ ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের ভূমিকা মোটেই সন্তোষজনক ছিল না বলে মনে করছে দল। দলের পুরোনো ও বর্ষীয়ান নেতাদের গুরুত্ব না দেওয়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার–সহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ শোনা গিয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছর হাওড়ায় খ্রিস্টমাস কার্নিভাল চলাকালীন পার্কিং নিয়ে মনোজ তিওয়ারি এবং সুজয় চক্রবর্তীর অনুগামীদের মধ্যে বিবাদ প্রকাশ্যে চলে আসে। এমনকী মনোজের উপস্থিতিতে তাঁর অনুগামীরা হাওড়া পুরসভার তৎকালীন পুর প্রশাসক সুজয় চক্রবর্তীকে ঠেলে ফেলে দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তা নিয়ে দলের পুরোনো নেতারা মনোজের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন। সেই ঘটনার খবর কানে যেতেই মনোজের উপরে ভীষণই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। শিবপুর এলাকায় বেআইনি প্রোমোটিংয়ের পিছনেও মনোজের অনুগামীরা সরাসরি মদত জোগাচ্ছেন বলে দলের কাছে বারবার অভিযোগ আসছিল। সব মিলিয়ে মনোজের ভূমিকায় বেজায় অসন্তুষ্ট ছিল দল। তাঁকে নিয়ে দলের ভিতরে ও বাইরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় এ বার আর তাঁকে প্রার্থী করার সাহস দেখায়নি তৃণমূল। তাঁর জায়গায় প্রার্থী করা হয়েছে বালির বর্তমান বিধায়ক রানা চট্টোপাধ্যায়কে।

    এক জেলা তৃণমূল নেতার কথায়, ‘মনোজের তুলনায় রানার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। সেজন্যই তাঁকে বালি থেকে শিবপুরে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ রানার পরিবর্তে হাওড়া সদরের যুব তৃণমূল সভাপতি কৈলাস মিশ্রকে বালিতে প্রার্থী করা হয়েছে। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বালিতে রানা ও কৈলাসের দ্বন্দ্ব এতদিন আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল। যদিও প্রকাশ্যে দু’জনের কেউই কখনও তা স্বীকার করেননি। অভিষেকের অনুগামী বলে পরিচিত কৈলাস গত কয়েক বছর ধরেই বালিতে ভীষণই সক্রিয়। দলের জনসংযোগ যাত্রা হোক কিংবা দলীয় সভায় লোক নিয়ে যাওয়া, তৃণমূলের যে কোনও কর্মসূচিতে কৈলাসকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা যায়। ২০২০-তে লকডাউনের সময় থেকেই কৈলাস নানা সময়ে মানুষের সমস্যা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। জনসংযোগের ক্ষেত্রেও অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন কৈলাস। বিশেষত দলের যুব অংশের কাছে কৈলাসের জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখেই তাঁকেই বালিতে প্রার্থী করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

    ডোমজুড়ের বিধায়ক কল্যাণ ঘোষকেও এ বার আর টিকিট দিচ্ছে না তৃণমূল। পরিবর্তে হাওড়া জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ তাপস মাইতিকে প্রার্থী করা হয়েছে। তাপস দলের ডোমজুড় কেন্দ্র সভাপতিও। জেলা তৃণমূল নেতারা জানাচ্ছেন, গত পাঁচ বছরে ডোমজুড়ের বেহাল নিকাশি, ভাঙাচোরা রাস্তা, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নিয়ে বিধায়কের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট ছিলেন এলাকার সাধারণ মানুষ। দলীয় কর্মীরাও বিধায়কের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছিলেন। দুর্ব্যবহারেরও অভিযোগ ছিল কল্যাণ ঘোষের বিরুদ্ধে। গত বর্ষায় ডোমজুড়ের একাধিক গ্রামে ঘরবাড়ি দিনের পর দিন জলমগ্ন হয়ে থাকায় বাসিন্দারা বিধায়কের কাছে সুরাহার জন্য গিয়েছিলেন। সেই সময় কল্যাণ তাঁদের ওপরওয়ালার উপরে ভরসা করতে বলেন। তা নিয়ে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কয়েক মাস আগে বালি–জগাছা ব্লকের সাঁপুইপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বাবু মণ্ডলের উপরে প্রাণঘাতী হামলা হয়। তারপরেই অভিযুক্তদের সঙ্গে বিধায়কের একাধিক ছবি সামনে আসে। এ সব কারণেই তাঁকে প্রার্থী করা হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। সে তুলনায় তাপসের বিরুদ্ধে কোনও গুরুতর অভিযোগ নেই। ফলে তাঁকেই বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

    সম্প্রতি পিলখানায় প্রোমোটার খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত দুষ্কৃতীদের সঙ্গে হাওড়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক গৌতম চৌধুরীর ছবি প্রকাশ্যে আসার পরে তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও তাঁকে এ বারও দল প্রার্থী করেছে।

  • Link to this news (এই সময়)