• বাদ ‘প্রভাবশালী’ সুদীপ্ত! হতাশ অসিত–মনোরঞ্জন, টিকিট পেলেন না কাঞ্চনও
    এই সময় | ১৮ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়, শ্রীরামপুর: এক সময় তাঁকে মনে করা হতো, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ছায়াসঙ্গী। মন্ত্রীত্ব না পেলেও বিগত পাঁচ বছরে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন রাজ্য স্বাস্থ্য প্রশাসনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। চিকিৎসক বদলি থেকে ডাক্তারি পরীক্ষার দুর্নীতি, বিভিন্ন বিতর্কে তাঁর নাম জড়ালেও তৃণমূলের বর্ষীয়ান বিধায়ক সুদীপ্ত রায়ের কেউ কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেননি। তা সত্ত্বেও এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় জায়গা পেলেন না শ্রীরামপুরের চারবারের বিধায়ক। কলকাতা থেকেও একবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে মোট পাঁচবার তিনি বিধায়ক হয়েছেন। তাঁর মতো একজন হেভিওয়েট নেতাকে প্রার্থী না করায় দলের অন্দরেই গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এ বার সুদীপ্তর ডানা ছাঁটার প্রক্রিয়া শুরু করে দিল তৃণমূল? সুদীপ্ত ছা়ডাও হুগলি জেলার আরও একাধিক প্রভাবশালী বিধায়ককে প্রার্থী তালিকায় জায়গা দেয়নি তৃণমূল। এঁদের মধ্যে রয়েছেন সপ্তগ্রামের বিধায়ক তপন দাশগুপ্ত, চুঁচুড়ার বিধায়ক অসিত মজুমদার, পাণ্ডুয়ার বিধায়ক রত্না দে নাগ, বলাগড়ের বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী এবং উত্তরপাড়ার বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিক।

    তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, সুদীপ্ত রায়ের জায়গায় শ্রীরামপুর কেন্দ্রে তৃণমূলের হয়ে লড়বেন দলের অন্যতম মুখপাত্র তন্ময় ঘোষ। ২০০৮ সাল থেকে টানা চারবার শ্রীরামপুর কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন সুদীপ্ত রায়। গত বিধানসভা ভোটে শ্রীরামপুর স্টেডিয়াম মাঠে সভা করতে এসে বলে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্ক মন্তব্য করেছিলেন, ‘সুদীপ্তদার কোনও নেগেটিভ ভয়েস নেই।’ নেত্রীর ‘কাছের লোক’ বলে পরিচিত সুদীপ্ত প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়ায় অনেকেই বিস্মিত। দলের একাংশের ব্যাখ্যা, তাঁর শরীর ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে মূলত বয়সজনিত কারণে তাঁকে এ বার প্রার্থী করা হয়নি। যদিও এ দিন তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম দিন থেকেই দলের সৈনিক। সিপিএম জমানা থেকে দল যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, হাসি মুখে পালন করেছি। রাজনৈতিক জীবনে অনেক উত্থান–পতন দেখেছি। নেত্রী ও দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে আমার কোনও আক্ষেপ নেই।’

    প্রার্থী তালিকায় জায়গা পাননি চুঁচুড়া ও সপ্তগ্রামের তিন বারের বিধায়ক অসিত মজুমদার ও তপন দাশগুপ্তও। তপন দাশগুপ্ত দলের অত্যন্ত প্রবীণ নেতা। দল ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তিনি ছিলেন হুগলি জেলার সভাপতি। এক সময় কৃষি বিপণন দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ২০২১ সালে সপ্তগ্রাম বিধানসভা থেকে জয়ী হন। কিন্তু এ বার দল আর তাঁকে প্রার্থী না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর জায়গায় প্রার্থী হয়েছেন ফুটবলার বিদেশ বসু। এ ব্যাপারে তপন দাশগুপ্তে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘দল যেটা ভালো মনে করেছে, সেটাই করেছে। এর বেশি কিছু বলার নেই।’

    চুঁচুড়ার প্রবীণ বিধায়ক অসিত মজুমদারকেও প্রার্থী করেনি তৃণমূল। তাঁর জায়গায় প্রার্থী করা হয়েছে দলের তরুণ নেতা দেবাংশু ভট্টাচার্যকে। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা অসিত অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। চুঁচুড়ার সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও প্রকাশ্যে বিবাদে জড়িয়েছেন। আদালতে পেশকারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া অসিত সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁকে প্রার্থী না করায় এ দিন অসিতের বাড়ির সামনে ভিড় জমান অনুগামীরা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা কর্মীদের আবেগ। নেত্রী বুঝেছেন, আমার থেকে দেবাংশু ভট্টাচার্য বয়সে তরুণ। সে অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা নেবে।’ রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন বলেও জানান অসিত। বলেন, ‘আমার ডিগ্রি আছে। আমি আদালতে ফিরব। দল দায়িত্ব দিলে ভেবে দেখব।’

    বলাগড়ের বিধায়ক দলিত সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী এবং উত্তরপাড়ার বিধায়ক অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিককেও এ বার প্রার্থী করেনি দল। উত্তরপাড়ায় প্রার্থী করা হয়েছে তরুণ আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বলাগড়ে মনোরঞ্জনের বদলে প্রার্থী করা হয়েছে জেলা পরিষদের সভাধিপতি রঞ্জন ধাড়াকে।

    তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, বলাগড়ে কোনও ভূমিপুত্রকে প্রার্থী করতে হবে, এই দাবিতে সরব হয়েছিলেন দলের নিচুতলার কর্মীরা। সেই দাবিকে মান্যতা দিয়েই রঞ্জনকে প্রার্থী করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মনোরঞ্জন বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নিয়েছি।’

    পাণ্ডুয়াতেও নেত্রীর আস্থাভাজন চিকিৎসক তথা প্রাক্তন সাংসদ রত্না দে নাগকে এ বার প্রার্থী করছে না তৃণমূল। রত্না প্রয়াত শিল্পমন্ত্রী গোপাল দাস নাগের মেয়ে। বাম জমানায় জেলায় তৃণমূলের ভরাডুবি হলেও ২০০১ ও ২০০৬ সালে পর পর দু’বার শ্রীরামপুর থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন রত্না। ২০০৮ সালে হুগলি কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্ট্যোপাধ্যায়ের কাছে পরাজিত হন। কিন্তু নেত্রীর সুনজরে থাকা রত্নাকে পাণ্ডুয়া থেকে টিকিট দিয়ে ২০২১ সালে বিধায়ক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার সেখানে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন দলের পুরোনো কর্মী সমীর চক্রবর্তী। এ দিন রত্না বলেন, ‘দলনেত্রী যাঁকে প্রার্থী করেছেন, তিনিই আমাদের প্রার্থী। আমরা তাঁর হয়েই প্রচার করব।’ ছয় কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করলেও জাঙ্গিপাড়ায় স্নেহাশিস চক্রবর্তী, চণ্ডীতলায় স্বাতী খন্দকার, সিঙ্গুরে বেচারাম মান্না, হরিপালে করবী মান্না, ইন্দ্রনীল সেন, অরিন্দম গুঁইদের উপরে এ বারও ভরসা রেখেছে দল।

  • Link to this news (এই সময়)