সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) নিয়ে সোমবার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রাজ্য সরকার। তাতে পরিষ্কার, কর্মরত কোনও গ্রুপ–এ,বি,সি স্তরের কর্মচারী হাতে ডিএ–র বকেয়া টাকা পাবেন না। তাঁদের টাকা জমা পড়বে জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ডে (জিপিএফ)। শুধুমাত্র বকেয়া ডিএ–র টাকা অ্যাকাউন্টে যাবে গ্রুপ–ডি কর্মী ও পেনশন প্রাপকদের। তবে, তার পরেও কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে এই বিজ্ঞপ্তিতে। রয়েছে কিছু প্রশ্নও।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে মূল যে প্রশ্নটা উঠছে, সেটা হলো শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, পঞ্চায়েত, পুরসভা, স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থা, বিধিবদ্ধ সংস্থা, সরকারি আন্ডারটেকিং সংস্থাগুলির অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং পেনশন প্রাপকরা কবে এই বকেয়া পাবেন? এ নিয়ে পরিষ্কার দিশা নেই বিজ্ঞপ্তিতে। একই সঙ্গে ২০০৮-এর এপ্রিল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বকেয়া ডিএ কবে, কী ভাবে মেটানো হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। অথচ রবিবার ডিএ দেওয়ার ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ডিএ–র আওতায় আসবেন এই সরকারি কর্মচারীরাও। অথচ সোমবার প্রকাশ্যে আসা এই সংক্রান্ত নির্দেশিকায় (যার তারিখ রয়েছে ১৩ মার্চ) এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।
অর্থ দপ্তরের কর্তারা জানাচ্ছেন, ২০১৬–য় হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এইচআরএমএস) চালু করে। এই পোর্টালে সরকারি কর্মীদের সব তথ্য রাখা হয়। তবে, ২০০৮–এর পর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সরকারি অফিসার ও কর্মীদের কোনও তথ্য এই পোর্টালে নেই। ওই সময়ে কর্মরতদের কত ডিএ প্রাপ্য—তার হিসেব পেতে রাজ্যের এজির (অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল) দ্বারস্থ হতে হবে অর্থ দপ্তরকে। সরকারি কর্মচারীদের একাংশের প্রশ্ন, এই তথ্য কবে নবান্ন এজির কাছ থেকে সংগ্রহ করবে, তার উল্লেখও নেই সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে।
‘কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ়’ থেকে ‘কর্মচারী পরিষদ’–এর প্রশ্ন, গত বছরের ১৬ মে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে বকেয়া ডিএ–র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ২ ফেব্রুয়ারিও সুপ্রিম কোর্ট ডিএ মেটানোর রায় দিয়েছে। তারপরেও নবান্ন কেন এই তথ্য সংগ্রহ করেনি? সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই সব কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বিশদ বিবরণ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ কিংবা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সংস্থাগুলির কাছে রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর সব তথ্য শিক্ষা দপ্তরের কাছে রয়েছে। পুরসভা, পঞ্চায়েতের কর্মীদের সব তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির হাতে রয়েছে। জেলার স্কুল ইনস্পেক্টর, পুরসভা, পঞ্চায়েত বা স্বাশাসিত সংস্থাগুলি কর্মী সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য শিক্ষা, পুর ও নগরোন্নয়ন, পঞ্চায়েত–সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানোর কথা। কত দিনের মধ্যে এই কাজ হবে, সেটা স্পষ্ট নয়। এতেই প্রশ্ন উঠেছে, এই কর্মীরা বকেয়া ডিএ কবে পাবেন?
‘কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ়’–এর সাধারণ সম্পাদক তথা ডিএ মামলকারী মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে অমান্য করে রাজ্য সরকার ভোটের আগে এই চমক দিয়েছে।’ তিনি জানিয়েছেন, বকেয়া ডিএর ২৫ শতাংশ সরকারি হিসেবেই ১০,৩৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি। সরকারি কর্মীদের মোট বকেয়া ৪১,৪৭০ কোটি টাকা। রাজ্য সরকারই শীর্ষ আদালতকে এই তথ্য দিয়েছিল। একই সঙ্গে জানিয়েছিল, বাকি টাকা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বাধীন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে ১৫ মে-র মধ্যে কয়েকটি কিস্তিতে মেটাতে হবে। প্রথম কিস্তির টাকা ৩১ মার্চের মধ্যে মেটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য সরকার বকেয়া মেটানোর নির্দেশ মানেনি। ‘বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে শুধু অবমাননাই করা হয়নি, বিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রচুর ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে।’ ‘কর্মচারী পরিষদ’–এর সভাপতি দেবাশিস শীল বলেন, ‘রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত আদালত অবমাননার সামিল। আমাদের দায়ের করা অবমাননার মামলার শুনানির অপেক্ষায় রয়েছি।’ যদিও তৃণমূলপন্থী ‘স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ় ফেডারেশন’–এর তরফে প্রতাপ নায়েকের বক্তব্য, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা, আসন্ন নির্বাচনের খরচ, সব কিছু মাথায় রেখেও মুখ্যমন্ত্রী বকেয়া ডিএ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি যখন আশ্বাস দিয়েছেন, তখন সবাই এই টাকা সময়মতোই পাবেন।’