শুভাশিস সৈয়দ
স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি দেখতেন শিক্ষার আলো থেকে অনেক দূরে শুকনো মুখের শিশুগুলো। ওরা কি স্কুলের দরজায় পা রাখবে না? এই একটা অনুভূতি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ২০০২ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে বাড়ির উঠোনে পেয়ারা গাছের তলায় বাচ্চাগুলোকে পড়ানোর দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। এর পরে এক একটি ধাপ পেরিয়ে দাঁড় করিয়েছেন নিজের স্কুলকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে BBC তাঁকে ‘পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ প্রধানশিক্ষক’-এর স্বীকৃতি দেয়। এর পর জলঙ্গি দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। ২০২৬ সালে মুর্শিদাবাদের সেই বাবর আলিকে বিধানসভায় নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল তৃণমূল। রাজিও হলেন, টিকিটও পেলেন। জলঙ্গি বিধানসভায় এ বার তৃণমূল প্রার্থী বছর ৩৩-এর ‘খুদে মাস্টার’।
‘এই সময় অনলাইন’-কে বাবর বলেন, ‘আমি শিক্ষা জগতের মানুষ। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিকতা আমায় মুগ্ধ করেছে। পাশাপাশি আমার মনে হয়েছে, রাজনীতিতে এসে এই এলাকার মানুষের জন্য আরও বেশি করে কাজ করা যেতে পারে। এটা একটা প্ল্যাটফর্ম।’
তাঁর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে লড়াকু মানসিকতা, উনি দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে এই জায়গায় পৌঁছেছেন। কাজ করলে ভালো-খারাপ দুটোই থাকে। তবে উনি রাজ্যের কথা সবসময় চিন্তা করেন। রাজ্যের জন্য পরিশ্রম করেছেন। ওঁর প্রকল্পগুলো বিভিন্ন জায়গায় নকল করা হচ্ছে।’
শিক্ষক বাবর আলি বলেন, ‘যাঁরা ভারতের নাগরিক, তাঁদের তো নাগরিকত্ব থাকতে হবে। সামান্য ত্রুটির কারণে তাঁদের যদি নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার চলে যায়, সমস্যার সম্মুখীন হন, সেটা আমাদের কাছে কাম্য নয়। একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে টার্গেট করে চক্রান্ত হয়েছে। শেষে দেখা গিয়েছে, সব স্তরের মানুষেরই SIR-এর জন্য ক্ষতি হয়েছে। তবে আমি মনে করি, এগুলোর সমাধান হওয়া উচিত।’
বাবরের কথায়, ‘সীমান্ত সমস্যা অবশ্যই এই কেন্দ্রে আছে। রাজ্য সরকারের প্রাথমিক ভাবে করণীয় কিছু নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয় সীমান্ত সমস্যা দূর করা। তবে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার মিলে আলোচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে এই সমস্যা মেটানো উচিত। আশা করা যায় এই সমস্যার সমাধান হবে।’
জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হচ্ছে শিক্ষকের। আপাতত চক-ডাস্টার থেকে দূরে সরে এ বার কাঁধে ঝান্ডা নিয়ে জনসংযোগে নামার পালা। রাজনীতির পাঠ শিখতেও হবে, শেখাতেও হবে। যাত্রাপথ অবশ্যই কণ্টকাকীর্ণ। তবে জিতে এলে কী কী করবেন? বাবর বলেন, ‘এখানে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের একটা প্রয়োজন আছে। একটি অগ্নি নির্বাপণ কেন্দ্র দরকার। এ ছাড়াও পানীয় জল, শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরও উন্নয়ন, প্রাথমিক ভাবে সেগুলি করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমি মনে করি।’
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার ভাবতা এলাকার বাসিন্দা বাবর। সরকারি সাহায্য ছাড়াই, শুধুমাত্র সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সংস্থার আর্থিক সাহায্যে ‘আনন্দ শিক্ষা নিকেতন’ গড়ে তুলেছেন তিনি। স্কুলের পড়ুয়া সংখ্যা ৪০০-র বেশি। রাজ্য সরকার স্বীকৃত প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্তরে এই স্কুলে পড়াশোনা হয়। শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন আব্দুর রজ্জাক। ৩০ হাজারের উপরে ব্যবধানে জিতেছিলেন তিনি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সিপিএমের প্রার্থী সইফুল ইসলাম মোল্লা।