সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
দু’বছরের ফারাকে খরচ বাড়ছে প্রায় ২৫ শতাংশ! প্রাথমিক অঙ্কটা অন্তত তেমনই। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (SIR) পরে বাংলায় এ বারের বিধানসভা ভোটে (West Bengal Assembly Election 2026) প্রাথমিক ভাবে খরচ হতে পারে অন্তত দু’হাজার কোটি টাকা। গত রবিবার বাংলায় বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে দেশের নির্বাচন কমিশন (Election Commission)। তবে এই ভোটের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে গত অক্টোবরে ‘সার’ ঘোষণার পর থেকেই। সেই কারণে এ বার নির্বাচনের খরচ অনেকখানি বাড়ছে বলে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর সূত্রের খবর।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, কমিশনের কোনও নিজস্ব আয়ের সংস্থান নেই। নিয়ম অনুযায়ী, এই খরচ দিতে হবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে। কমিশনের ফর্মুলা অনুযায়ী, কোনও রাজ্যের বিধানসভা ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে যে খরচ হয়, তার ৩০ শতাংশ কেন্দ্র ও ৭০ শতাংশ রাজ্যের দেওয়ার কথা। আবার সাধারণ নির্বাচন বা লোকসভা ভোটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজ্য ৩০ শতাংশ ও কেন্দ্র ৭০ শতাংশ টাকা বরাদ্দ করে। অর্থাৎ বাংলার ক্ষেত্রে খরচ দু’হাজার কোটি টাকা হলে ১,৪০০ কোটি টাকা দিতে হবে রাজ্য সরকারকেই। তবে কমিশন সূত্রের দাবি, এটা এখনও পর্যন্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী খরচ ধরা হয়েছে। এই খরচের মাত্রাটা আরও বাড়তে পারে।
২০২১–এ বাংলায় বিধানসভা ভোট হয়েছিল কোভিডের সময়ে। সে বার ভোটে খরচ হয়েছিল এক হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০২৪–এ সেই খরচ বেড়ে হয়েছিল ১,৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দু’বছর আগের লোকসভা ভোটের তুলনায় এ বার খরচ বাড়তে চলেছে ২৫ শতাংশের মতো। এ বারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা কিন্তু অনেকটাই কমছে ‘সার’–এর পরে। ২০২৫–এর ভোটার তালিকায় যেখানে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ, সেটা এ বার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ। এরপরে সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় যে ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ ভোটাররা ঠাঁই পাবেন, তাঁরাও ভোট দিতে পারবেন। ভোটার সংখ্যা তবুও আগের বারের থেকে অনেকটাই কমবে।
কমিশনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এ বার প্রতি বুথে ভোটারের সংখ্যা ১,৫০০ থেকে কমিয়ে গড়ে ১,২০০ করা হয়েছে। ফলে বুথের সংখ্যা ৮০,৬৮১ থেকে সামান্য বেড়ে হচ্ছে ৮০,৭১৯। ভোটারদের সুবিধার জন্য প্রতি বুথে আলাদা করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে চায় কমিশন। তাঁরা বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) সঙ্গে ভোটারদের সাহায্য করবেন।
পাশাপাশি এ বার ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতে এক জন করে সাধারণ পর্যবেক্ষক এবং গড়ে চারটি বিধানসভা কেন্দ্র পিছু এক জন পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং ১০০ জন এক্সপেন্ডিচার পর্যবেক্ষক–সহ ৪৭৮ জনকে নিয়োগ করা হয়েছে বাংলায়। তাঁরা এ মাসেই রাজ্যে চলে আসবেন। এটা সাম্প্রতিক অতীতে অন্য কোনও রাজ্যে হয়নি। এরপরেও নিয়োগ হবে মাইক্রো অবজ়ার্ভার। পাশাপাশি দু’দফায় ভোটের জন্য প্রায় আড়াই হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী আনা হচ্ছে। তাদের থাকা, যাতায়াতের গাড়ি–সহ একটা বড় অঙ্কের টাকা খরচ হবে লজিস্টিক্সে। সরকারি আধিকারিকদের মতে, ভিন রাজ্য থেকে আসা পর্যবেক্ষকদের ‘বায়না’ মেটাতেও অনেক টাকা খরচ হয়, যা সামাল দিতে নাস্তানাবুদ হতে হয় জেলাশাসকদের।
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যে ‘সার’-এর কাজে বাজেট ধরা ছিল ৪৫০ কোটি টাকা। যা এখনই ৫০০ কোটি ছাপিয়ে গিয়েছে। ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্তদের নথি স্ক্রুটিনির জন্য এ বার ব্যতিক্রমী ভাবে পশ্চিমবঙ্গে ৭০০ জন বিচারককে নিয়োগ করতে হচ্ছে। তাঁদের সাম্মানিক হিসেবে ১ লক্ষ করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এতেই খরচ হবে ৭ কোটি টাকা। ‘বিচারাধীন’ যাঁদের নাম বাদ পড়বে, তাঁদের আবেদন জানানোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে বলেছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়ে। এর জন্য খরচ কত হবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। তবে ভিন রাজ্য থেকে যে বিচারকরা আসছেন, তাঁদের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য এ রাজ্যের বিচারকদের ভাড়ার টাকাও দিতে হবে।
‘সার’ প্রক্রিয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন দু’জন প্রাক্তন আমলা–সহ ২৬ জন আমলাকে রোল পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেছিল। ছিলেন ৮ হাজার মাইক্রো অবজ়ার্ভার, যাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী। তাঁদের সাম্মানিক ও অন্যান্য খরচও ধরতে হচ্ছ। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তর ‘সার’-এর জন্য মাসে চার হাজার টাকা ভাড়ায় আট হাজার ল্যাপটপ নিয়েছে দু’মাসের জন্য। কমিশনের এক আধিকারিক বলেন, ‘সাধারণ খরচের পাশাপাশি জুতো পালিশ থেকে হজমি গুলি, এমনকী ঘরে জ্বালানোর ধূপের জন্যও কোনও কোনও পর্যবেক্ষক বিল করছেন। কলকাতায় রাজ্য সরকারের সার্কিট হাউসে থাকা এক পর্যবেক্ষক যেমন তাঁর চেম্বারে ছোট ফ্রিজ কিনে দেওয়ার আব্দারও করেছেন। এ সবের খরচও তো ধরতে হচ্ছে।’