• ব্যাক গিয়ার EC-র, ৫ অফিসারকে ভিন রাজ্যে পাঠানোর নির্দেশ স্থগিত, রাষ্ট্রপতির শাসনের চেষ্টা দেখছেন মুখ্যমন্ত্রী
    এই সময় | ২০ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: ৭২ ঘণ্টায় রাজ্যের ৪৩ জন পুলিশকর্তা–আমলাকে বদলির বেনজির নির্দেশ। তার সঙ্গে আবার অপসারিত এবং পদে বহাল কয়েকজন পুলিশকর্তাকে অন্য রাজ্যের ভোটে বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত! বৃহস্পতিবার এ বার পাঁচ পুলিশ আধিকারিককে তামিলনাড়ুর ভোটে পর্যবেক্ষক করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে হলো দেশের নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। বুধবারই বিধাননগরের সিপি মুরলীধর শর্মা, শিলিগুড়ির সিপি সৈয়দ ওয়াকার রাজা–সহ ১৫ জন পুলিশকর্তাকে তামিলনাড়ুর ভোটে পুলিশ অবজ়ার্ভার করে পাঠানোর নির্দেশিকা জারি করেছিল কমিশন। এঁদের মধ্যে মুরলীধর বা ওয়াকারকে কমিশন কিন্তু ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরে অপসারণ করেনি। ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, হঠাৎ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ কমিশনারেটের সিপিকে অন্য রাজ্যে পাঠিয়ে দিলে এই দু’টি কমিশনারেটের আইন–শৃঙ্খ‍‍লা পরিস্থিতি ভোটের সময়ে কে সামাল দেবে? শেষমেশ এই দুই আইপিএসকেই তামিলনাড়ুতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করল কমিশন। পাশাপাশি আরও তিন অপসারিত আইপিএস প্রবীণ ত্রিপাঠী, আমনদীপ ও আকাশ মাঘারিয়ারও ভিন রাজ্যে পর্যবেক্ষক করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। তবে কী কারণে এই স্থগিতাদেশ, তার ব্যাখ্যা কমিশন দেয়নি। পুলিশ–প্রশাসনের প্রবীণ আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, কমিশন যদি মনে করে কোনও অফিসারকে দিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব নয়, তা হলে তাঁকে অপসারণ করতেই পারে। কিন্তু এ বার যে ভাবে গুরুত্বপূর্ণ আমলা ও পুলিশকর্তাদের অপসারণ করা হচ্ছে, আবার তা কিছু ক্ষেত্রে রদ করা হচ্ছে, তা শুধু বেনজিরই নয়, অনেকটা দূরদর্শিতাহীন ও স্বেচ্ছাচারমূলক হয়ে যাচ্ছে। ফলে নিজেরা নির্দেশ জারির পরে আবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই নির্দেশিকা স্থগিত করতে করছে।

    এর মধ্যে আবার গত তিন দিনে একের পর এক পুলিশকর্তা–আমলাকে বদলির সিদ্ধান্ত নিয়ে এ দিন ফের কমিশনকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ শাণিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যসচিব–স্বরাষ্ট্রসচিব থেকে শুরু করে পুলিশকর্তাদের অপসারণের নির্দেশিকাগুলি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে মমতা লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন যে ভাবে বাংলাকে নিশানা করছে তা নজিরবিহীন ও গভীর উদ্বেগজনক। মুখ্যসচিব, ডিজিপি থেকে শুরু করে ৫০ জনের বেশি শীর্ষ আধিকারিককে সরানো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং চূড়ান্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন রাজনীতিকরণ সংবিধানের উপরে সরাসরি আঘাত। ত্রুটিপূর্ণ সার–প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তবুও কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ বাংলার মানুষকে আরও বিপদে ফেলছে।’

    এ দিন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ফের চিঠি দিয়েছেন মমতা। তাতে তিনি লিখেছেন, রাজ্যে ‘সার’ প্রক্রিয়া চলাকালীন জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের পরিকল্পিত ভাবে সরানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর আরও যুক্তি, যে ভাবে পুলিশ–আমলাদের সরানো হচ্ছে, তাতে আইন–শৃঙ্খলা, ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্ট, কোনও দুর্যোগ হলে তার মোকাবিলার কাজও ব্যাহত হতে পারে। তা ছাড়া মার্চ–এপ্রিল মাসে রাজ্যে কালবৈশাখী ও ঝড়বৃষ্টির সময়। সেক্ষেত্রে কোন অফিসাররা পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন? এক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হলে তার দায় কমিশনের উপরেই বর্তাবে বলে সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি সামনে আসার মধ্যেই রাজ্যের ছ’জন আইএএস অফিসারকে তামিলনাড়ুতে ভোটে পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হয়েছে। তার মধ্যে দু’টি দপ্তরের সচিবও আছেন।

    ঘটনা হলো, অপসারিত এসপি বা ডিআইজি বা তদূর্ধ্ব সিনিয়র অফিসারদের অপসারণের পরে রাজ্য সরকার যে পোস্টিং দিয়েছিল, সেখান থেকেও তাঁদের ভিন রাজ্যে পাঠানোর নির্দেশকে মোটেই ভালো ভাবে নিচ্ছে না রাজ্য সরকার। মমতা লিখেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে এখনও অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হয়নি। সিআইডি, এসটিএফ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার অফিসারদের সরিয়ে রাজ্যের প্রশাসনকে পঙ্গু করার ছক কষা হচ্ছে। বিজেপি এত মরিয়া কেন? যাঁদের সরানো হচ্ছে, তাঁদেরই আবার তড়িঘড়ি অন্যত্র পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হচ্ছে।’ তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন কার্যত জরুরি অবস্থা জারি করে বাংলায় ভোট করাতে চাইছে। তৃণমূলনেত্রীর অভিযোগ, ‘গণতান্ত্রিক নীতির বদলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে রাজ্যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা ও রাষ্ট্রপতির শাসন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বাংলার মানুষের মন জয় করতে না পেরে বিজেপি এখন ভয় দেখিয়ে ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে। আমি রাজ্যের সৎ আধিকারিকদের পাশে আছি। বাংলা কখনও মাথা নোয়ায়নি। বাংলা রুখে দাঁড়াবে এবং এই বিভাজনমূলক চক্রান্তকে পরাস্ত করবে।’

    রাজ্য প্রশাসন সূত্রের খবর, সিনিয়র পুলিশ–আমলাদের বদলির পরে ২০২১ ও ২০২৪–এর ভোটের পরে যে সব থানা এলাকায় ভোট ও ভোট পরবর্তী হিংসা হয়েছে, সেখানকার অফিসারদের তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছে কমিশন। ফলে ভোট শুরু হওয়ার আগে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তত চারশো–সাড়ে চারশো পুলিশ অফিসারও বদলি নিয়ে চিন্তায় আছেন। একলপ্তে এত অফিসার বদলি হলে বিকল্প পুলিশ আধিকারিক কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে চর্চা চলছে কমিশনের অন্দরেও। যদিও মমতার বক্তব্য খারিজ করে রাজ্যসভা ভোটে বিজেপির জয়ী প্রার্থী রাহুল সিনহা বলেন, ‘আপনি যে এক মাস আগে ৮৫ জনের মতো পুলিশ অফিসারকে পরিবর্তন করলেন, তার বেলা! কেন করলেন? তা হলে ওই ৮৫ জন অপদার্থ ছিলেন? এটা কী ধরনের খেলা? আপনি সরাতে পারেন, তাতে কোনও দোষ নেই, অন্য ভাবে পরিবর্তন হলেই আপনি এ সব বলবেন?’

  • Link to this news (এই সময়)